সিলেট-জাফলং-সুনামগঞ্জে ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি ও জশনে জুলুস
নিজস্ব প্রতিবেদক
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে সিলেট নগরী, গোয়াইনঘাটের জাফলং ও সুনামগঞ্জে বর্ণাঢ্য মুবারক র্যালি ও জশনে জুলুস অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২৬ আগস্ট) পৃথক আয়োজনে এসব কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক ছাত্র-জনতা ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লি অংশ নেন। দিনভর নাতে রাসুল, কাসিদা ও প্রশংসাগীতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা।
সিলেটে তালামীযে ইসলামিয়ার মুবারক র্যালি
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে বাংলাদেশ আনজুমানে তালামীযে ইসলামিয়ার উদ্যোগে সিলেট নগরীতে বর্ণাঢ্য ‘মুবারক র্যালি’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২৬ আগস্ট) সোবহানীঘাটস্থ হযরত শাহজালাল দারুচ্ছুন্নাহ ইয়াকুবিয়া কামিল মাদরাসা প্রাঙ্গণ থেকে র্যালিটি বের হয়। এতে সিলেট নগরীসহ বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো ছাত্র-জনতা অংশ নেন।
সকাল থেকেই র্যালিতে অংশ নিতে মাদরাসা প্রাঙ্গণে ছাত্র-জনতার সমাগম শুরু হয়। সকাল ১০টা থেকে জোহরের নামাজের আগ পর্যন্ত প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বাদ জোহর বর্ণাঢ্য র্যালিটি নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
র্যালিতে ছিল নানা রঙের ফেস্টুন, ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড। এসব ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ডে প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শানে রচিত বিভিন্ন কবিতা ও কাসিদার পঙ্ক্তি লেখা ছিল। আশিকে রাসুলদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় নাতে রাসুল ও প্রশংসাগীতি। ‘সালাম সালাম নবী সালাম সালাম’, ‘মাওলা ইয়া সাল্লি ওয়া সাল্লিম’, ‘বালাগাল উলা বি-কামালিহি’, ‘শামসুদ্দোহা আসসালাম’সহ বিভিন্ন নাতের সুমধুর সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে নগরীর আকাশ-বাতাস।
র্যালিপূর্ব আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, হযরত মুহাম্মদ (সা.) মানবজাতির জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর জীবন ও আদর্শ মানবতার জন্য অনুসরণীয়। তিনি শান্তি, ন্যায়, মানবিকতা, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
র্যালি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মারুফ আহমদের সভাপতিত্বে এবং সদস্য সচিব আরিফ হোসাইন সামাদের পরিচালনায় আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন দারুল ফিকর ওয়াল ইফতা আল ইসলামী বাংলাদেশের চেয়ারম্যান হযরত আল্লামা মুফতি গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী। প্রধান বক্তার বক্তব্য দেন তালামীযে ইসলামিয়ার কেন্দ্রীয় সভাপতি মনজুরুল করিম মহসিন।
সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম এ মালেক, হযরত শাহজালাল দারুচ্ছুন্নাহ ইয়াকুবিয়া কামিল মাদরাসার অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হযরত আল্লামা কমরুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী, বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহর সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা জ.উ.ম আব্দুল মুনঈম মনজলালী, মাওলানা আবু জাফর নুমান, মহাসচিব মাওলানা একেএম মনোওর আলী, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মাহমুদ হাসান চৌধুরী ফুলতলী, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজির উদ্দিন পাশা, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মাওলানা মোহাম্মদ নজমুল হুদা খান, প্রশিক্ষণ সম্পাদক মাওলানা আবু ছালেহ মো. কুতবুল আলম, তালামীযে ইসলামিয়ার কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি কবির আহমদ, সাধারণ সম্পাদক এস এম মনোয়ার হোসেন, সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী।
র্যালি বাস্তবায়ন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক কুতুব আল ফরহাদের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া আলোচনায় তালামীযে ইসলামিয়ার সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা নজীর আহমদ হেলাল, মাওলানা মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, মাওলানা রেদওয়ান আহমদ চৌধুরী, মাওলানা মাহবুবুর রহমান ফরহাদ, সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মাওলানা আতাউর রহমান, মাওলানা মুহা. শরীফ উদ্দিন, মাওলানা হুমায়ূনুর রহমান লেখন, সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মুজতবা হাসান চৌধুরী নুমান, সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মুহাম্মদ উসমান গণিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আলী রাব্বি রতন, সাবেক কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সৈয়দ আহমদ আল জামিল, কেন্দ্রীয় সহ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মুসলেহ উদ্দিন কাওছার, সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক রফিকুল ইসলাম তালুকদারসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
জাফলংয়ে প্রায় ১২ হাজার মুসল্লির জশনে জুলুস
একই দিনে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংয়ে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে বিশাল জশনে জুলুস ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এ জশনে জুলুসে প্রায় ১২ হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লি অংশ নেন বলে আয়োজকরা জানান।
বুধবার সকাল ৯টার দিকে উপজেলার বিভিন্ন সমাজের মুরব্বিদের নেতৃত্বে খণ্ড খণ্ড জুলুস জাফলং চা-বাগান এলাকায় এসে মিলিত হয়। পরে প্রায় ৩০টি সমাজের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন এবং তরিকাপন্থী জাকেরান-আশেকানরা ব্যানার নিয়ে এতে অংশ নেন।
সকাল ১০টার দিকে জাফলং চা-বাগান এলাকা থেকে মূল জশনে জুলুস বের হয়। জুলুসটি জাফলং বাজার, মামার বাজার, মোহাম্মদপুর, কালিনগর ও মুসলিমনগরসহ বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে লাখেরপাড় হামিদ আলী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভায় বক্তারা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শুভাগমন, অনুপম জীবনাদর্শ, মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়-ইনসাফ, ভ্রাতৃত্ব ও শান্তির বাণী নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁরা বলেন, মহানবী (সা.) মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ রেখে গেছেন। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে ন্যায়, মানবিকতা, সম্প্রীতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
আলোচনা শেষে দেশ ও জাতির শান্তি-শৃঙ্খলা, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। একই সঙ্গে বিশ্বের সব মুসলমানের শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণ কামনা করা হয়।
সুনামগঞ্জে জশনে জুলুস
এদিকে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে সুনামগঞ্জে জশনে জুলুস ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২৬ আগস্ট) বেলা ১১টায় রাজাপুরা দরবার শরীফের আধ্যাত্মিক সংগঠন হোসাইনীয়া কমিটি বাংলাদেশ সুনামগঞ্জ জেলা শাখার ব্যবস্থাপনায় এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
জশনে জুলুসটি শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ক্বারী মোহাম্মদ হোসাইনের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঐতিহ্যবাহী রাজাপুরা দরবার শরীফের পীর আল্লামা শাহ মোহাম্মদ নাদিমুর রশিদ আল ক্বাদেরী। তিনি বলেন, ইসলাম শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবতার ধর্ম। মহানবী (সা.) তাঁর সুমহান আদর্শ ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে মানুষকে অন্ধকার থেকে সত্য ও আলোর পথে পরিচালিত করেছেন। সমাজ থেকে হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করে মহানবী (সা.)-এর ক্ষমা, সহনশীলতা ও মানবিকতার আদর্শ জীবনে বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনা সভায় অ্যাডভোকেট আব্দুর রইছ, হোসাইনীয়া কমিটি বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা সিরাজুল ইসলাম খায়ের, হোসাইনীয়া যুব কমিটির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি মুফতি কে এম শামীম আহমদ চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি কে এম নজরুল ইসলাম, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার নুরুল হক, জাহাঙ্গীরনগর ইউপি চেয়ারম্যান রশিদ আহমদ, জেলা যুবদল নেতা হুমায়ুন কবিরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন। এ সময় আলেম-ওলামা, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুলসংখ্যক ধর্মপ্রাণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
সিলেট নগরী, জাফলং ও সুনামগঞ্জে পৃথক এসব কর্মসূচিকে ঘিরে দিনভর ছিল উৎসবমুখর ও ধর্মীয় আবহ। নাতে রাসুল, কাসিদা, দরুদ ও প্রশংসাগীতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে বিভিন্ন সড়ক ও জনপদ।