নিজস্ব প্রতিবেদক, হবিগঞ্জ:
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে দেড় মাসের ব্যবধানে আবারও ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রবল স্রোতে বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করায় কয়েকটি গ্রামের রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। এতে হবিগঞ্জ সদর ও বাহুবল উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রোববার (২৩ আগস্ট) সকাল ১১টার দিকে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টির পানির চাপে কালীগঞ্জ এলাকার সংস্কারাধীন বাঁধের একটি অংশ ভেঙে যায়। এরপর প্রবল বেগে পানি লোকালয়ে ঢুকতে শুরু করে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে সুঘর, চরহামুয়া, বনগাঁও, আদ্যপাশাসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের রাস্তাঘাট ও ফসলি জমিতে পানি উঠেছে।
স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। অনেকেই বাড়িঘর থেকে প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি কিংবা নিরাপদ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিতে শুরু করেছেন। পানি দ্রুত বাড়তে থাকলে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এর আগে গত ৯ জুলাই রাতে একই স্থানে খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে ব্যাপক এলাকায় পানি ঢুকে পড়ে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তখন অন্তত ২০ থেকে ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এতে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি, মাছের ঘের ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ওই ভাঙনের পর হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বাঁধটি মেরামতের উদ্যোগ নেয়। মেরামতকাজের জন্য প্রায় ৮২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ ৪৩ দিনেও কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় বাঁধটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। জুলাই মাসেও বাঁধ মেরামতের কাজে ধীরগতির অভিযোগ উঠেছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়মতো এবং যথাযথভাবে বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় একই স্থানে আবারও ভাঙন দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, বর্ষা মৌসুমের আগে বাঁধের সংস্কারকাজ সম্পন্ন করা গেলে নতুন করে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।
সুঘর গ্রামের বাসিন্দা সুমন মিয়া বলেন, ‘সঠিক সময়ে বাঁধ মেরামত না হওয়ায় আমাদের দ্বিতীয়বার ভাঙনের কবলে পড়তে হয়েছে। বাড়ির চারপাশের হাওরের পাকা ধান তলিয়ে গেছে। এতে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছি আমরা।’
চরহামুয়া গ্রামের আব্দুল হক বলেন, ‘মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে বাঁধটি আবারও ভেঙে গেল। গত বন্যায় কৃষকদের যে ক্ষতি হয়েছিল, সেটি তারা এখনো পুষিয়ে উঠতে পারেননি।’
বনগাঁও গ্রামের শফিক মিয়া বলেন, ‘বাঁধ মেরামতের কাজে কর্তৃপক্ষের অবহেলা রয়েছে। তা না হলে বাঁধ মেরামত করতে এতদিন লাগার কথা নয়। বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় সবার মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনেকেই বাসাবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছেন।’
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাইদুর রহমান বলেন, ভারতের ত্রিপুরায় প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে উজান থেকে উচ্চবেগে পানি প্রবেশ করেছে। অল্প সময়ের মধ্যে খোয়াই নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ায় বাঁধের সংস্কারাধীন অংশ ভেঙে গেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বাঁধটি পরিদর্শন করেছি। পানি কমলে দ্রুত সময়ের মধ্যে বাঁধ মেরামতের চেষ্টা করা হবে।’
বাঁধ মেরামতে অনিয়ম ও কাজে ধীরগতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘আমাদের জানামতে এখন পর্যন্ত কোনো অনিয়ম হয়নি। আমরা দ্রুত সময়ে বাঁধ মেরামতের চেষ্টা করেছি। প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে বর্ষা মৌসুমে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।’
এদিকে, নতুন করে বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। পানি আরও বাড়লে হবিগঞ্জ সদর ও বাহুবল উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে কৃষিজমি, ঘরবাড়ি ও সড়ক যোগাযোগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।