জৈন্তাপুরে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, এবারও শুধু আশ্বাস—পাকা ড্রেনের অপেক্ষায় ১০০ পরিবার
নিজস্ব প্রতিবেদক।
দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে অবশেষে স্থায়ী সমাধানের পথে এগোচ্ছে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম ঠাকুরের মাটি গ্রামের প্রায় ১০০ পরিবার। পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারি বরাদ্দে পাকা ড্রেন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কাজের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৩ লাখ টাকা।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় চিকনাগুল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক নেতৃবৃন্দ, মসজিদ কমিটির সদস্য ও জলাবদ্ধতায় ভুক্তভোগীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় ড্রেন নির্মাণের বিষয়ে ঐকমত্য হয়।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, স্থানীয়ভাবে উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করে পাকা ড্রেন নির্মাণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হবে। যেসব স্থানে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্লটের কারণে পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সেসব প্লট মালিকের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় জায়গা ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হবে।
অভিযোগ থেকে উদ্যোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ থাকায় সামান্য বৃষ্টি হলেই এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বর্ষা মৌসুমে অনেক সময় বসতবাড়িতেও পানি প্রবেশ করে। এতে সরকারি সড়ক, বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও মসজিদে যাতায়াতেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে গত ১৪ জুলাই চানপুরী ছড়া সংলগ্ন এলাকার ভুক্তভোগীরা জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুনন্দা রায়ের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
অভিযোগের পর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে স্থানীয়দের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দের ব্যবস্থা করে পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।
দফায় দফায় প্রশাসনের পরিদর্শন
এরপর ২২ জুলাই ইউএনওর নির্দেশনায় চিকনাগুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান চৌধুরী এবং ২৩ জুলাই উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মিলন কান্তি রায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
পরবর্তীতে ৪ আগস্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় প্রতিনিধিরা ইউএনও সুনন্দা রায়ের সঙ্গে পুনরায় সাক্ষাৎ করেন। সে সময় ড্রেন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিয়ে আলোচনা হলেও সরকারি বরাদ্দ না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
তবে বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ শুরু করার আশ্বাস দেওয়া হয়। পাশাপাশি স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় সহযোগিতায় প্লাস্টিকের পাইপ বসিয়ে সাময়িকভাবে পানি নিষ্কাশনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
এরই ধারাবাহিকতায় ৭ আগস্ট পিআইও কার্যালয়, ইউনিয়ন পরিষদ ও এলজিইডির সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে ড্রেন নির্মাণের জন্য ৩ লাখ টাকার এস্টিমেট ও বরাদ্দ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ৮ আগস্ট ইউএনওর নির্দেশে উপজেলা প্রকৌশলী দীপংকর চক্রবর্তী সম্ভাব্য ড্রেন নির্মাণস্থল পরিদর্শন করেন।
আপত্তি নিয়ে নতুন জটিলতা
এদিকে পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী পথ নির্ধারণ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। সাময়িকভাবে প্লাস্টিকের পাইপ বসানোর প্রস্তুতি নেওয়া হলেও মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে লিখিত আপত্তি জানানো হয়।
বিষয়টি জানার পর ১৭ আগস্ট বিকেল ৩টার দিকে ইউএনও সুনন্দা রায় সরেজমিনে পশ্চিম ঠাকুরের মাটি এলাকায় গিয়ে জলাবদ্ধ পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন। তিনি ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন।
পরে স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান চৌধুরী ও ইউপি সদস্য ওহিদুর রহমানকে নির্দেশনা দেন।
পাকা ড্রেন নির্মাণে ঐকমত্য
শুক্রবারের আলোচনা সভায় সাময়িক ব্যবস্থা বাদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য একটি হাউজিং এলাকার ভেতর দিয়ে পাকা ড্রেন নির্মাণের বিষয়ে উপস্থিত সবাই একমত হন।
আগামী রবিবারের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্লট মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় জায়গা ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে ইউপি সদস্য ওহিদুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ নিশ্চিত করা গেলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার প্রকোপ অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে এলাকার সড়ক ও বিভিন্ন শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মানুষের চলাচলও স্বাভাবিক হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু সাময়িকভাবে পানি সরিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। পানি চলাচলের স্থায়ী পথ নিশ্চিত করে পরিকল্পিতভাবে ড্রেন নির্মাণ করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি সড়ক ও জনসাধারণের যাতায়াতের পথ নিরাপদ রাখতে হবে।
সভায় ইউনিয়নের বিশিষ্ট মুরব্বি মাওলানা মুহিবুর রহমান, চিকনাগুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান চৌধুরী, ইউপি সদস্য ওহিদুর রহমানসহ স্থানীয় সামাজিক নেতৃবৃন্দ, মসজিদ কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সরকারি ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ, উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশনা এবং জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়দের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত ড্রেন নির্মাণের কাজ শুরু হবে। এতে পশ্চিম ঠাকুরের মাটির দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি প্রায় ১০০ পরিবারের দুর্ভোগও কমবে।