নিজস্ব প্রতিবেদক: পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে কোরআন ও হাদিসের আলোকে এর তাৎপর্য ও গুরুত্ব তুলে ধরেছেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী।
এক প্রবন্ধে তিনি বলেন, উম্মতের বিভিন্ন দুর্যোগপূর্ণ সময়ে তৎকালীন আয়েম্মা ও মুজতাহেদীনরা হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের ঈমান-আকায়েদ কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াসের মাধ্যমে পর্যালোচনা করে বিভিন্ন গ্রন্থ সংকলন করেছেন। তাদের অনুসারীরাই আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াত নামে পরিচিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
হাফিজ মাছুম আহমদ বলেন, বর্তমান সময়ে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.), কিয়াম, ফরজ নামাজের পর হাত তুলে দোয়া করাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মুসলিম সমাজে বিভ্রান্তি ও মতবিরোধ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা তুলে ধরা প্রয়োজন।
তিনি উল্লেখ করেন, আরবি ভাষার বিভিন্ন অভিধানে ‘মিলাদ’, ‘মাওলেদ’ ও ‘মাওলুদ’ শব্দের অর্থ জন্ম, জন্মকাল, জন্মস্থান বা জন্মদিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই অর্থে ‘মিলাদুন্নবী’ বলতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম, জন্মকাহিনী এবং তৎসংশ্লিষ্ট ঘটনাবলি আলোচনা করাকে বোঝানো হয়। আর ‘ঈদ’ বলতে আনন্দ বা খুশি প্রকাশকে বোঝানো হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কোরআনের আলোকে মিলাদুন্নবী
হাফিজ মাছুম আহমদ তাঁর লেখায় সূরা ইউনুসের ৫৭-৫৮ নম্বর আয়াত উল্লেখ করে বলেন, আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতের কারণে আনন্দ প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর ব্যাখ্যায়, আল্লাহর রহমত ও হেদায়েতের প্রতি আনন্দ প্রকাশের বিষয়টি ঈদে মিলাদুন্নবীর সঙ্গে সম্পর্কিত।
তিনি সূরা আম্বিয়ার ১০৭ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, মহান আল্লাহ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে ‘জগতসমূহের জন্য রহমত’ হিসেবে প্রেরণ করেছেন। পাশাপাশি সূরা আলে ইমরানের ১০৩ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত স্মরণ করার বিষয়টিও তুলে ধরেন।
লেখকের মতে, এসব আয়াতের আলোকে মহানবী (সা.)-এর পৃথিবীতে আগমনের দিন আনন্দ প্রকাশ করা এবং তাঁর জীবন ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা করা উত্তম আমল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
হাদিসের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী
হাফিজ মাছুম আহমদ তাঁর লেখায় মহানবী (সা.)-এর জন্ম ও মর্যাদা সম্পর্কিত বিভিন্ন হাদিস উল্লেখ করেন। এর মধ্যে হযরত আবু কাতাদাহ আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত সহিহ মুসলিমের একটি হাদিস উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে জানান—এ দিন তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন এবং এ দিনই তাঁর প্রতি নবুয়ত অবতীর্ণ হয়েছে।
এ ছাড়া হযরত ইরবাদ ইবনে সারিয়াহ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনকে হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া ও হযরত ঈসা (আ.)-এর সুসংবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
হাফিজ মাছুম আহমদ আরও বলেন, মহানবী (সা.) নিজেই তাঁর বংশ, জন্ম ও মর্যাদা সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরামের সামনে আলোচনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি তিরমিজি শরিফে বর্ণিত একটি হাদিসের উল্লেখ করেন, যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর বংশপরিচয় এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে সর্বোত্তম সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
সাহাবায়ে কেরামের যুগেও মিলাদ আলোচনা হতো—লেখকের দাবি
লেখায় হাফিজ মাছুম আহমদ দাবি করেন, সাহাবায়ে কেরামের যুগেও মহানবী (সা.)-এর জন্ম ও জীবনীসংক্রান্ত আলোচনা করা হতো। এ প্রসঙ্গে তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ও হযরত আবু দারদা (রা.)-এর সূত্রে বিভিন্ন বর্ণনার উল্লেখ করেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম ও জীবনকাহিনী আলোচনা, আল্লাহর প্রশংসা এবং রাসূলের প্রতি দরুদ পাঠের বিষয় পাওয়া যায়। এ থেকে তিনি মনে করেন, মহানবী (সা.)-এর জন্ম ও জীবন নিয়ে আলোচনা করা এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও আনন্দ প্রকাশের ভিত্তি ইসলামী ঐতিহ্যে রয়েছে।
তিনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর জন্ম ও জীবনকাহিনী আলোচনা, তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে মুসলমানরা তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রকাশ করতে পারেন।
সবশেষে হাফিজ মাছুম আহমদ বলেন, কোরআন ও হাদিসের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে মহানবী (সা.)-এর জীবন, চরিত্র ও আদর্শ আলোচনা করা মুসলমানদের জন্য ঈমানি চেতনা জাগ্রত করার একটি মাধ্যম হতে পারে। তিনি সবাইকে মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও দরুদ পাঠের আহ্বান জানান।
লেখক: হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট। তিনি জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এছাড়া তিনি সিলেট নগরীর কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সাবেক ইমাম ও খতীব, হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেটের সাবেক প্রিন্সিপাল এবং হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া দাখিল মাদ্রাসা, দক্ষিণ সুরমা, সিলেটের সাবেক প্রধান শিক্ষক।