আশীষ দাশ গুপ্ত, হবিগঞ্জ প্রতিনিধি:
হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার লাখাই বাজার থেকে বামৈ তিন পুল পর্যন্ত প্রায় ৬ দশমিক ২০ কিলোমিটার সড়কটি বর্ষা এলেই পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে উপজেলার ১ নম্বর লাখাই ইউনিয়নের অন্তত ১৫টি গ্রামের মানুষ প্রতি বছর চার মাস ধরে চরম দুর্ভোগে পড়েন। দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি উঁচু করে নির্মাণের দাবি জানিয়ে এলেও এখনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বর্ষা মৌসুমে সড়কটির অধিকাংশ অংশ পানির নিচে চলে যাওয়ায় ১৫টি গ্রামের মানুষ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। লাখাই বাজারে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজে যাতায়াতের জন্য তাদের নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয়। শুধু লাখাই ইউনিয়নের মানুষই নয়, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, ইটনা ও ভাটি অঞ্চলের বাসিন্দা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার অনেক মানুষও এই সড়ক ব্যবহার করেন।
বর্ষাকালে সন্ধ্যার পর নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। চারদিকে কচুরিপানায় নৌকা চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জরুরি রোগী হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের দাবি, যোগাযোগ সংকটের কারণে অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।
লাখাই উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মো. শাহাজান বলেন, সন্ধ্যার পর কাউকে হাসপাতালে নিতে হলেও সহজে নৌকা পাওয়া যায় না। অনেক সময় পরদিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। অথচ মাত্র ৬ দশমিক ২০ কিলোমিটার সড়ক উঁচু করে নির্মাণ করা হলে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
তিনি আরও জানান, ১৯৯৯ সালে সাংবাদিক প্রোটন দাশ গুপ্ত দৈনিক লাল সবুজ ও সাপ্তাহিক সুগন্ধা পত্রিকায় “রাস্তা নাই, ঘাট নাই, থানার নাম লাখাই” শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন। এরপরও বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সংসদ সদস্যদের কাছে দাবি জানানো হলেও বাস্তবায়ন হয়নি।
লাখাই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোস্তফা কামাল খরছু বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন এলেই জনপ্রতিনিধিরা সড়কটি উঁচু করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু নির্বাচন শেষে সেই প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়িত হয় না।
সরেজমিনে দেখা যায়, শুকনো মৌসুমে এই সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করলেও বর্ষা এলেই পুরো চিত্র পাল্টে যায়। বিশেষ করে শিকনপুর ব্রিজ থেকে লাখাই বাজার পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার অংশ চার মাস পানির নিচে থাকে।
স্বজন গ্রামের বাসিন্দা রায়হান উদ্দিন বলেন, শুকনো মৌসুমে লাখাই থেকে বামৈ যেতে ১৫ থেকে ২০ টাকা ভাড়া লাগলেও বর্ষায় নৌকায় যেতে ৫০ টাকা গুনতে হয়। সন্ধ্যার পর রিজার্ভ নৌকা ভাড়া করতে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।
ঢাকাস্থ লাখাই উপজেলা জাতীয়তাবাদী ফোরামের সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. শাহাজান মিয়া বলেন, লাখাই ইউনিয়নের মানুষের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে দ্রুত সড়কটি উঁচু করে বছরের ১২ মাস যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে।
স্বজন গ্রামের বাসিন্দা ও বামৈ মুক্তিযোদ্ধা জিয়া কলেজের শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, দেড় শতাধিক বছরের পুরোনো লাখাই বাজারের সঙ্গে মানুষের স্বাভাবিক যোগাযোগ নিশ্চিত করতে দ্রুত সড়কটি উঁচু করা জরুরি।
লাখাই ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, বিগত সময়ে লাখাইয়ের প্রত্যাশিত উন্নয়ন হয়নি। বর্তমানে শিকনপুর ব্রিজ থেকে লাখাই বাজার পর্যন্ত বর্ষাকালে প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি নৌকা চলাচল করে এবং ছয় থেকে সাত হাজার মানুষ এই পথে যাতায়াত করেন। শুধু লাখাই নয়, আশপাশের বিভিন্ন জেলার মানুষও এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল।
লাখাই ইউনিয়ন ছাত্র কল্যাণ পরিষদের সভাপতি গোলাম রব্বানী শাকির বলেন, বর্ষা মৌসুমে চার মাস তারা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তাই লাখাই বাজার থেকে বামৈ পর্যন্ত ডুবো সড়কটি উঁচু করে স্থায়ীভাবে চলাচল উপযোগী করার দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে হবিগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন, লাখাই-বামৈ সড়ক উঁচু করার প্রস্তাব সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি বর্তমানে যাচাই-বাছাই কমিটির বিবেচনায় রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ বিষয়ে লাখাইবাসী শিগগিরই সুখবর পেতে পারেন।