গোলপাতার ঘরে শিক্ষা, উন্নয়নের ছোঁয়া মেলেনি ৩৬ বছরের সরকারি বিদ্যালয়ে
বাগেরহাট প্রতিনিধি:
বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ উপজেলার তেলিগাতী ইউনিয়নের ১৯০নং পশ্চিম তেলিগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বর্তমানে এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থার চরম অবহেলার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি দেশের শিক্ষা খাতে ব্যাপক উন্নয়নের ধারার বাইরে থেকে গেছে। বর্তমানে জরাজীর্ণ গোলপাতার একটি ঘরেই চলছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান।
বিদ্যালয়ের মূল ভবনটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার পর ২০২২ সালে নিলামের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়। একই বছরে সাময়িকভাবে পাঠদান চালিয়ে নিতে একটি গোলপাতার ঘর নির্মাণ করা হয়। সেই ঘরেই বিগত কয়েক বছর ধরে চলছে শ্রেণি কার্যক্রম।
সরেজমিনে দেখা যায়, সামান্য বৃষ্টিতেই গোলপাতার ফুটো দিয়ে পানি পড়ে শ্রেণিকক্ষে। শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ভিজে যায়, বেঞ্চ পানিতে ডুবে যায় এবং মাটির মেঝে কাদায় একাকার হয়ে পড়ে। রোদ-বৃষ্টির এমন প্রতিকূল পরিবেশে শতাধিক শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন পাঠ গ্রহণ করতে হচ্ছে।
বরাদ্দ এলেও হয়নি কোনো কাজ
বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ ও চারপাশের জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে এটিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে পরিত্যক্ত কোনো গোয়ালঘর বলেই মনে হয়। দীর্ঘদিনের দাবি ও তদবিরের পর ২০২৫ সালের ১ জুন এলজিআরডির আওতায় জরুরি ভিত্তিতে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৪ লাখ টাকা মেরামত বরাদ্দ আসে। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল।
কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেই বরাদ্দের কোনো কাজই বাস্তবায়ন হয়নি। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষা অফিস ও এলজিআরডি অফিসে বারবার যোগাযোগ করেও কোনো সমাধান পাননি। এলজিআরডির একজন প্রকৌশলীর সূত্র অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত ৪ লাখ টাকার বরাদ্দ ফেরত দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। তাদের প্রশ্ন, বিদ্যালয়ের এমন করুণ অবস্থার পরও বরাদ্দের টাকা কেন কাজে লাগানো হলো না এবং কী কারণে তা ফেরত দেওয়া হলো?
শিক্ষকদের হতাশা
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রোজিনা আক্তার বলেন, ২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থার ছবি ও ভিডিও সংযুক্ত করে তিনি একাধিকবার উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেছেন। কিন্তু এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বর্ষাকালে পাঠদান বন্ধ রাখতে হতে পারে।
সাবেক প্রধান শিক্ষক সেখ মুজিবুর রহমান বলেন, পুরোনো ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ার পর বহু চেষ্টা করেও নতুন ভবনের বরাদ্দ আনতে পারেননি। অথচ অনেক বিদ্যালয়ে একাধিক ভবন থাকলেও এই বিদ্যালয়ে একটি মানসম্মত শ্রেণিকক্ষও নেই।
সহকারী শিক্ষক এনামুল কবির বলেন, ২০২০ সালে যোগদানের পর থেকে শিক্ষকরা আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করে আসছেন এবং বিভিন্ন পরিদর্শনকারী কর্মকর্তাও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তবে এমন জরাজীর্ণ পরিবেশে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন।
শিক্ষার্থীদের আকুতি
শিক্ষার্থী আব্রিতা, মুমিনুল, মরিয়ম ও ফাতেমা জানায়, বৃষ্টি হলেই তাদের বই-খাতা ভিজে যায়, শ্রেণিকক্ষ কাদায় ভরে যায় এবং ঠিকমতো বসে ক্লাস করা যায় না। তাদের ভাষায়, “আমাদের শিক্ষকরা অনেক ভালো পড়ান। পাশের স্কুলগুলোতে সুন্দর ভবন আছে, কিন্তু আমাদের স্কুল গোলপাতার। আমরাও কি সুন্দর স্কুলে পড়তে পারব না?”
অভিভাবকদের ক্ষোভ
স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবক বলেন, ডিজিটাল যুগে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গোলপাতার ঘরে পাঠদান চলা অত্যন্ত দুঃখজনক। শিক্ষা খাতে বিভিন্ন উন্নয়ন ও বরাদ্দের কথা শোনা গেলেও এই বিদ্যালয়টি কেন একটি নতুন ভবন পাচ্ছে না, তা তাদের বোধগম্য নয়। তাদের মতে, এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবেরই প্রতিফলন।
বর্তমানে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যেমন হতাশ হয়ে পড়ছেন, তেমনি শতাধিক শিশুর শিক্ষাজীবনও অনিশ্চয়তার মুখে। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত একটি নতুন বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ এবং সাময়িকভাবে নিরাপদ পাঠদানের বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় এ অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।