নিজস্ব প্রতিবেদক।
কানাডার অন্টারিও প্রদেশের ওয়েন সাউন্ড শহরে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী শরীফ রহমান হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অপরাধীকে পালাতে সহায়তা করার দায়ে দুই ব্যক্তির মধ্যে প্রত্যেককে ২১ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। শুক্রবার (৬ জুন) বিকেলে ওয়েন সাউন্ড আদালত রবার্ট বাসবি ইভান্স সিনিয়র (৪৯) ও ব্যারি ইভান্সকে ‘ম্যানস্লটার (অনিচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড) পরবর্তী সহায়তা’ দেওয়ার অপরাধে এই সাজা প্রদান করে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট রাতে ওয়েন সাউন্ডের ‘দ্য কারি হাউস’ রেস্তোরাঁর মালিক শরীফ রহমান তিন ব্যক্তির কাছ থেকে ১৪৫.৪৩ ডলারের খাবারের বিল আদায়ের চেষ্টা করলে হামলার শিকার হন। গুরুতর মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় তাকে লন্ডন, অন্টারিওর একটি ট্রমা সেন্টারে নেওয়া হয়। এক সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২৪ আগস্ট তিনি মারা যান। পরে পুলিশ ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে ঘোষণা করে।
মামলায় ২৫ বছর বয়সী রবার্ট ইভান্স জুনিয়র ম্যানস্লটারের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছেন। তার সাজা ঘোষণা করা হবে আগামী ১০ জুলাই ২০২৬। ক্রাউন ও প্রতিরক্ষা পক্ষ যৌথভাবে তার জন্য ৪২ মাসের কারাদণ্ডের সুপারিশ করেছে। তবে ইতোমধ্যে স্কটল্যান্ড ও কানাডায় কাটানো সময়ের বিশেষ হিসাবের কারণে তিনি ৩৬ মাসের সমপরিমাণ সাজা ভোগ করেছেন বলে গণ্য হচ্ছেন।
অন্যদিকে রবার্ট ইভান্স জুনিয়রের বাবা রবার্ট বাসবি ইভান্স সিনিয়র এবং চাচা ব্যারি ইভান্স আদালতে স্বীকার করেছেন যে তারা হত্যাকাণ্ডের পর মূল অভিযুক্তকে শনাক্তকরণ এড়াতে এবং দেশত্যাগে সহায়তা করেছিলেন। যদিও হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার কোনো অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে আনা হয়নি।
আদালত তাদের ডিএনএ নমুনা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে এবং ১০ বছরের জন্য অস্ত্র বহনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। স্কটল্যান্ড ও কানাডায় পূর্বে কাটানো কারাভোগের সময় বিবেচনায় নেওয়ায় তাদের আর মাত্র একদিন কারাগারে থাকতে হবে বলে জানা গেছে। এরপর তাদের কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি (CBSA)-এর হেফাজতে নেওয়া হতে পারে।
স্কটল্যান্ডে গ্রেপ্তার ও প্রত্যর্পণ
বাসবি ইভান্স সিনিয়রকে ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় গ্রেপ্তার করা হয় এবং ব্যারি ইভান্সকে ২৯ অক্টোবর ২০২৪ ডালকিথে গ্রেপ্তার করা হয়। শুক্রবার পর্যন্ত তারা যথাক্রমে প্রায় ২২ ও ১৯ মাস ধরে হেফাজতে ছিলেন।
প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া চলাকালে তারা স্কটল্যান্ডে আটক ছিলেন। পরে কানাডায় ফেরত আসতে সম্মতি দিলে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর তাদের কানাডায় আনা হয়।
শুক্রবারের শুনানির জন্য তাদের পেনেটানগুইশিনের সেন্ট্রাল নর্থ কারেকশনাল সেন্টার থেকে ওয়েন সাউন্ডে আনা হয়। প্রতিরক্ষা আইনজীবীরা স্কটল্যান্ডে কাটানো সময়সহ প্রতিটি দিনের জন্য দেড় দিনের সমপরিমাণ ক্রেডিট দেওয়ার আবেদন করেছিলেন।
আদালতে অনুশোচনা প্রকাশ
রবার্ট ইভান্স জুনিয়র আদালতে একটি লিখিত বিবৃতি পড়ে শোনান, যেখানে তিনি ঘটনার জন্য গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করেন। বাসবি ইভান্স সিনিয়র ও ব্যারি ইভান্সও পৃথক বিবৃতি দেন, যা তাদের আইনজীবীরা আদালতে পড়ে শোনান।
এর আগে ৫ জুন অনুষ্ঠিত শুনানিতে তিনজনই দোষ স্বীকার করেন। বিচারক সি. চর্নি তাদের স্বীকারোক্তি গ্রহণ করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনার বক্তব্য শোনেন। এরপর রবার্ট ইভান্স জুনিয়রকে ১০ জুলাইয়ের সাজা ঘোষণার আগ পর্যন্ত পুনরায় হেফাজতে পাঠানো হয়।
পরিবার ও অভিবাসন বিষয়ক প্রসঙ্গ
সাজার ক্ষেত্রে নমনীয়তার আবেদন জানিয়ে বাসবি ইভান্স সিনিয়রের আইনজীবী বলেন, ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে তাঁর পাঁচ সন্তান ও দীর্ঘদিনের সঙ্গী অপেক্ষা করছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে এই ঘটনার ক্ষতি উভয় পরিবারের ওপরই পড়েছে।
আইনজীবী আদালতে বলেন,
“মি. ইভান্সও বিষয়টি গভীরভাবে অনুভব করেন। কারণ মৃত ব্যক্তির একটি কন্যা রয়েছে, যে আর কখনও তার বাবাকে দেখতে পাবে না।”
শুনানির সময় বিচারক জানতে চান, “মূলত আপনারা কি সময় ভোগ করা সাজাকেই যথেষ্ট বলে বিবেচনার আবেদন করছেন? তাহলে এরপর কী হবে বলে আশা করছেন?”
জবাবে আইনজীবী জানান, “সিবিএসএ (CBSA) আসছে; তাদের বিরুদ্ধে অভিবাসন-সংক্রান্ত আটকাদেশ রয়েছে।”
দুই ব্যক্তিই যুক্তরাজ্যের নাগরিক। তাদের কানাডা থেকে বহিষ্কার (ডিপোর্টেশন) করা হবে কি না, সেটি আলাদা অভিবাসন প্রক্রিয়ার বিষয় এবং তা আদালতের সাজা ঘোষণার অংশ নয়।
ব্যারি ইভান্সের আইনজীবী তানিয়া বারিতো জানান, ব্যারি ইভান্স বৈধভাবে কানাডায় অবস্থান করছিলেন এবং তাঁর পাঁচ বছরের কর্ম-ভিসা ছিল। তবে এখন তিনি যত দ্রুত সম্ভব ইংল্যান্ডে ফেরত যেতে চান। ধারণা করা হচ্ছে, তাকে অভিবাসন শুনানিতে হাজির করা হবে এবং পরে যুক্তরাজ্যে ফেরত পাঠানো হতে পারে।
সিলেটের কৃতী সন্তান ছিলেন শরীফ রহমান
শরীফ রহমানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়নের ঘাটেরচটি এলাকায়। তিনি জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং সিলেট সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। ২০০১ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন।
পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগো থেকে ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্সে মাস্টার্স এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যামব্রিজ থেকে ২০১০ সালে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনে সাফল্যের পাশাপাশি প্রবাসে একজন সফল উদ্যোক্তা ও সমাজসেবক হিসেবেও তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
সুবিচারের দাবিতে পরিবার ও প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি
কানাডা ও যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরা শরীফ রহমানকে একজন সফল অভিবাসী, কমিউনিটি নেতা এবং নতুন প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক রোল মডেল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, শরীফ রহমান শুধু একজন ব্যবসায়ী ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশি অভিবাসী সমাজের গর্ব।
প্রবাসী বাংলাদেশিরা বলছেন, অপরাধী যে দেশেরই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাদের বিশ্বাস, পূর্ণাঙ্গ বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে শরীফ রহমানের পরিবার কিছুটা হলেও সান্ত্বনা পাবে এবং ওয়েন সাউন্ডের সেই অসংখ্য মানুষ স্বস্তি ফিরে পাবে, যাদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন এই বাংলাদেশি উদ্যোক্তা।
এদিকে দেশে অবস্থানরত শরীফ রহমানের বড় ভাই, ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমানও হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা চাই এই মামলায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক। আমার ভাইকে আর ফিরে পাব না, কিন্তু অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি হলে অন্তত সমাজে একটি বার্তা যাবে যে কোনো অপরাধই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।”
মূল অভিযুক্ত রবার্ট ইভান্স জুনিয়রের সাজা ঘোষণার দিকে এখন তাকিয়ে আছে শরীফ রহমানের পরিবার, প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং ওয়েন সাউন্ডের সাধারণ মানুষ। ১০ জুলাইয়ের রায়কে এই বহুল আলোচিত মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।