আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে বহুজাতিক শিক্ষার্থীদের ঈদ উদযাপন: তাকবির, ত্যাগ ও ভ্রাতৃত্বের অনন্য মিলনমেলা
জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান
হাজার বছরের ইতিহাস, জ্ঞান, সভ্যতা ও ইসলামী ঐতিহ্যের ধারক আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় -এ এবার পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়েছে এক ভিন্নমাত্রিক পরিবেশে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, তাকবিরের ধ্বনি, কোরবানির ত্যাগের শিক্ষা এবং বহুজাতিক ভ্রাতৃত্বের মিলনে পুরো ক্যাম্পাস রূপ নেয় এক বৈশ্বিক মুসলিম মিলনমেলায়।
বিশ্বের ১২০টিরও বেশি দেশের শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ঈদের দিনে যেন এক ক্ষুদ্র বিশ্ব মুসলিম সমাজে পরিণত হয়। এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার নানা প্রান্ত থেকে আগত শিক্ষার্থীরা ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের ভিন্নতা ভুলে এক কাতারে দাঁড়িয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেন। এ সময় প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও ছিলেন সক্রিয় ও প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে।
বুধবার (২৭ মে) ভোর থেকেই কায়রোর আকাশ-বাতাস মুখর হয়ে ওঠে তাকবিরের ধ্বনিতে—“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।” এই ধ্বনি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল, করিডোর ও প্রাঙ্গণে সৃষ্টি করে গভীর আধ্যাত্মিক আবহ, যা ইতিহাসের বহু শতাব্দী পেরিয়ে আসা এই প্রাচীন জ্ঞাননগরীকে যেন ইসলামের সোনালি যুগে ফিরিয়ে নেয়।
ফজরের নামাজের পর থেকেই শিক্ষার্থীরা নতুন পোশাকে সজ্জিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলসংলগ্ন মসজিদে সমবেত হতে থাকেন। মিশরের রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী সূর্যোদয়ের প্রায় ২০ মিনিট পর সারাদেশে একযোগে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। শাফেয়ি মাযহাব অনুসারে ঈদের নামাজে প্রথম রাকাতে অতিরিক্ত সাত তাকবির এবং দ্বিতীয় রাকাতে পাঁচ তাকবিরের মাধ্যমে নামাজ আদায় করা হয়।
নামাজে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের তাকবির ও কণ্ঠধ্বনি ভাষা, জাতি ও ভূগোলের সীমা অতিক্রম করে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি তৈরি করে। নামাজ শেষে খুতবায় রাসূলুল্লাহ (সা.), হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর আত্মত্যাগ, কোরবানির আধ্যাত্মিক তাৎপর্য এবং মুসলিম উম্মাহর ভ্রাতৃত্বের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। খুতবায় বলা হয়, কোরবানি কেবল পশু জবাই নয়; বরং এটি অহংকার, লোভ ও আত্মকেন্দ্রিকতা ত্যাগ করে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের শিক্ষা।
দ্বিতীয় খুতবার শেষে ইমাম মুসলিম উম্মাহর শান্তি, কল্যাণ ও নির্যাতিত মানুষের মুক্তির জন্য বিশেষ দোয়া করেন। মিশরে দীর্ঘ সম্মিলিত মোনাজাতের প্রচলন কম হলেও এই দোয়া শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে গভীর আবেগ সৃষ্টি করে।
নামাজ শেষে শুরু হয় ঈদের সবচেয়ে প্রাণবন্ত অধ্যায়—ভ্রাতৃত্বের মিলনমেলা। বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা একে অপরকে আলিঙ্গন করে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং স্মৃতিময় মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করেন। ভাষা, সংস্কৃতি ও বর্ণের ভিন্নতা থাকলেও ঈদের আনন্দ ও ইসলামী ভ্রাতৃত্ব সবাইকে এক সুতোয় আবদ্ধ করে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল বিশেষ উচ্ছ্বাস। তারা নিজেদের ঐতিহ্য অনুযায়ী কোলাকুলি, ছবি তোলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিবারের উদ্দেশে ঈদের শুভেচ্ছা জানান। প্রবাসের দূরত্ব ও নিঃসঙ্গতার মাঝেও এই সামষ্টিক আনন্দ কিছু সময়ের জন্য পরিবারবিচ্ছেদের কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল প্রধান অধ্যাপক ড. হিসাব আল-কাজী। তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোলাকুলি করেন, ঈদের শুভেচ্ছা জানান এবং চকলেট বিতরণ করেন। তার আন্তরিক আচরণ বিদেশি শিক্ষার্থীদের মাঝে গভীর আপনত্ব ও ভালোবাসার অনুভূতি সৃষ্টি করে।
মিশরীয় সংস্কৃতিতে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ে বলা হয় “কুল্লু সানা ওয়া আনতুম তাইয়িব” বা “কুল্লু সানা ওয়া আনতুম বিখাইর”—যার অর্থ হলো, “আপনাদের প্রতিটি বছর কল্যাণ ও শান্তিতে ভরে উঠুক।”
প্রবাসের ঈদ উদযাপনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা জানান, মায়ের হাতের রান্না, গ্রামের ঈদগাহ, পরিবার ও শৈশবের স্মৃতি খুব বেশি মনে পড়ে। তবে আল-আজহারের ধর্মীয় পরিবেশ, তাকবিরের ধ্বনি এবং আন্তর্জাতিক সহপাঠীদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন সেই শূন্যতাকে অনেকটাই পূরণ করে।
ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিকতা, জ্ঞানচর্চা ও বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্বের অনন্য সংমিশ্রণে আল-আজহারের এবারের ঈদ উদযাপন আবারও প্রমাণ করেছে—ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়, বরং এটি মানবতা, সহমর্মিতা, আত্মত্যাগ ও বৈশ্বিক ঐক্যের এক চিরন্তন সভ্যতা।