Template: 1
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
logo
channeljaintanews24.com
বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬ | ০৮:০৪ অপরাহ্ন
channeljaintanews24@gmail.com

বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জানাজায় চট্টগ্রামে মানুষের ঢল

✍ চ্যানেল জৈন্তা নিউজ
🕒 বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬ | ০৮:০৪ অপরাহ্ন

চট্টগ্রামের রাজনৈতিক আকাশে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, সংসদীয় রাজনীতি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের দীর্ঘ অভিযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বর্ষীয়ান রাজনীতিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে শেষ বিদায় জানাতে বৃহস্পতিবার জনসমুদ্রে পরিণত হয় নগরীর জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ। 

দলীয় বিভাজন, মতাদর্শিক ভিন্নতা কিংবা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সবকিছুকে ছাপিয়ে হাজারো মানুষের উপস্থিতি যেন জানান দিল, চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও যিনি নিজস্ব রাজনৈতিক বলয়, সাংগঠনিক দক্ষতা ও উন্নয়নকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেকে আলাদা উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, সেই ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে বিদায় জানাতে এদিন সকাল থেকেই মানুষের ঢল নামে।


বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকাল ১১টায় অনুষ্ঠিত হয় তার নামাজে জানাজা। জানাজার আগে জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে মরদেহ পৌঁছালে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ। প্রবীণ এই রাজনীতিককে একনজর দেখতে, শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এবং রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ স্মৃতিচারণে অংশ নিতে ছুটে আসেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, সিপিবি, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।


ফুলেল শ্রদ্ধায় আচ্ছাদিত হয়ে ওঠে তার কফিন। একের পর এক সংগঠন, সহযোদ্ধা, অনুসারী ও শুভানুধ্যায়ীরা পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান। জানাজার সারিতে দেখা যায় রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, ছাত্রনেতা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং সাধারণ মানুষকে। অনেকের চোখেই ছিল অশ্রু, কারও কণ্ঠে স্মৃতির ভার, আবার কারও ভাষ্যে উঠে আসে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের এক জীবন্ত সাক্ষীর প্রস্থান।


জানাজায় অংশ নেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, সাবেক সিটি মেয়র ও জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান, সিপিবি নেতা মোহাম্মদ শাহ আলম, বিভিন্ন বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধি, মীরসরাই অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দসহ অসংখ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব।


প্রয়াত নেতার বড় ছেলে সাবেদুর রহমান সমুও জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের ঘিরে এসময় সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ। দীর্ঘদিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার পর পরিবারের অভিভাবককে হারানোর বেদনা তাদের কণ্ঠে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


জানাজাপূর্ব সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তিত্ব। বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়ন, অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বে তার ভূমিকা দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি শুধু মীরসরাইয়ের প্রতিনিধি ছিলেন না, বরং সমগ্র চট্টগ্রামের উন্নয়নচিন্তাকে ধারণ করতেন।


উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান জাতি কখনো ভুলবে না। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সাহসী নেতৃত্বের প্রতীক এবং দলের দুঃসময়ের পরীক্ষিত নেতা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সংগঠনকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।


সাবেক সিটি মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, পাকিস্তান আমল থেকে তার সঙ্গে মোশাররফ হোসেনের সম্পর্ক। চট্টগ্রামের উন্নয়ন পরিকল্পনায় তিনি সবসময় বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। মানুষের কথা শুনতেন, রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক বজায় রাখতেন। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার নাম একটি স্থায়ী অধ্যায় হয়ে থাকবে।


প্রয়াত নেতার ছেলে সাবেদুর রহমান সমু আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, তার বাবা আজীবন দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করেছেন। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি দেশের স্বাধীনতা ও উন্নয়নের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে সবার কাছে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন তিনি।


জানাজা শেষে শোকাবহ পরিবেশ রূপ নেয় আবেগ, স্মৃতি ও রাজনৈতিক চেতনার এক মিশ্র আবহে। মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স যখন জমিয়াতুল ফালাহ প্রাঙ্গণ ত্যাগ করতে শুরু করে, তখন হাজারো নেতাকর্মী ও অনুসারী স্লোগানে মুখর করে তোলেন চারপাশ। “বীর চট্টলার মোশাররফ ভাই, আমরা তোমায় ভুলি নাই”, “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” এমন স্লোগানে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।


অনেককে কফিনবাহী গাড়ির পেছনে ছুটে যেতে দেখা যায়। রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের চোখে ছিল গভীর শোকের ছাপ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠের মূল ফটক ও আশপাশে সতর্ক অবস্থানে ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।


পরে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তার জন্মভূমি চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার ধুম গ্রামে। সেখানে বাদ আসর ফজলুর রহমান স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে তৃতীয় দফা জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।



ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের রাজনৈতিক জীবন ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার ধুম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পিতা এস রহমান ছিলেন ষাটের দশকের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। দেশভাগের পর কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে এসে তিনি ‘ওরিয়েন্ট বিল্ডার্স কর্পোরেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হন।


ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে ওঠেন মোশাররফ হোসেন। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য লাহোরে যান। সেখানে প্রকৌশল শিক্ষাকালেই তিনি ছয় দফা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। সেই সময় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।


লাহোর থেকে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি। ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে তার দৃশ্যমান উত্থান ঘটে।


মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধকালীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন তিনি। স্বাধীনতা-উত্তর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম ছিলেন তিনি।


স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সংসদীয় জীবনে তিনি চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই) আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।


আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন। পরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪-২০১৯ মেয়াদেও একই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন।


দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২৭ অক্টোবর রাজধানীর ভাটারা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়।


২০২৫ সালের ৫ আগস্ট গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে কারা হাসপাতাল থেকে তাকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে গত ১৪ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান তিনি। তবে শারীরিক অবস্থার ক্রমাবনতির মধ্যেই শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন এই প্রবীণ রাজনীতিক।


ব্যক্তিজীবনে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন তিন ছেলে ও এক মেয়ের জনক। তার ছেলে মাহবুব রহমান রুহেল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে চট্টগ্রাম-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।


তার মৃত্যুতে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে গভীর শূন্যতা। মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক রাজনীতি, সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও উন্নয়নকেন্দ্রিক রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই প্রবীণ রাজনীতিকের বিদায়কে অনেকেই দেখছেন একটি প্রজন্মের রাজনৈতিক পরিসমাপ্তি হিসেবে।


সূত্র সময়ের কন্ঠস্বর

ছবি
channeljaintanews24.com
logo
ভিজিট করুন
১৪.০৫.২০২৬
© চ্যানেল জৈন্তা নিউজ — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
channeljaintanews24.com