জৈন্তিয়ার ঐতিহ্য ‘ঢুপির মঠ’: ধ্বংসস্তূপে হারাতে বসেছে ২০০ বছরের রামেশ্বর শিবমন্দির
স্টাফ রিপোর্টার।
জৈন্তিয়া রাজ্যের ঐতিহাসিক নিদর্শন ঢুপির মঠ বা রামেশ্বর শিবমন্দির আজ অবহেলা আর ধ্বংসের মুখে। দ্বিতীয় রামসিংহের আমলে নির্মিত এই মন্দিরটি একসময় জৈন্তিয়া রাজ্যের অন্যতম বিস্ময়কর স্থাপনা হিসেবে পরিচিত ছিল।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, রাজা রামসিংহ ১৭৯৭ সালে নিজের স্মৃতি রক্ষার্থে এবং পাপ মোচনের উদ্দেশ্যে পাহাড়ের চূড়ায় এই মন্দির নির্মাণ করেন। শিলালিপি অনুযায়ী, মন্দির নির্মাণের আগেই সেখানে শিবলিঙ্গ পূজিত হতো। পরবর্তীতে তিনি সেটিকে সংরক্ষণে ‘রামেশ্বর শিবমন্দির’ প্রতিষ্ঠা করেন।
মন্দিরটি জৈন্তিয়ার রাজধানী থেকে কয়েক মাইল দক্ষিণে ঢুপি গ্রামের একটি উঁচু পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত ছিল, যা বর্তমানে ‘ঢুপির পাহাড়’ নামে পরিচিত। সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের পাশেই এর অবস্থান। সারী নদী পার হওয়ার পরই দূর থেকে পাহাড়টি চোখে পড়ে।
তাম্রলিপি ও শিলালিপি থেকে জানা যায়, ১৭১৯ ও ১৭২০ শকাব্দে শিবলিঙ্গ স্থাপন ও মন্দির নির্মাণের তথ্য পাওয়া যায়, যদিও এ নিয়ে সামান্য মতভেদ রয়েছে। পাহাড়ের চূড়ায় মনোরম পরিবেশে বৃক্ষবেষ্টিত এলাকায় সৌধ আকারে নির্মিত হয়েছিল মন্দিরটি।
তবে ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে মন্দিরটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূল কাঠামো ধ্বংস হয়ে গেলেও এখনো মন্দিরের ভিত্তি, দুটি ফটক ও কিছু স্থাপনার অংশবিশেষ টিকে আছে। দক্ষিণ পাশের বড় ফটকটি আংশিক হেলে পড়লেও এখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে, পাশাপাশি পূর্ব পাশের ছোট ফটকটিও দৃশ্যমান।
ঐতিহাসিকদের মতে, একসময় মন্দিরের সুউচ্চ চূড়া ১০-১২ মাইল দূর থেকেও দেখা যেতো। এছাড়া পাথরে নির্মিত একটি বৃষের মূর্তিও ছিল, যা দূর থেকে জীবন্ত মনে হতো। ভূমিকম্পে সেটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হয়।
ভূমিকম্পের পর স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে মন্দিরের ইট সরিয়ে নিয়ে যাওয়ায় কাঠামো আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে কিছু অসাধু ব্যক্তি গুপ্তধনের আশায় মন্দিরের ভিত্তিতে খুঁড়াখুঁড়ি করছে, যা অবশিষ্ট অংশের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলেছে।
স্থানীয়দের মতে, একসময় পাহাড়ের নিচ থেকে মন্দিরে ওঠার জন্য পাথরের তৈরি ১৮৯ ধাপের সিঁড়ি, প্রাচীর ও একটি পানির কূপ ছিল। তবে এখন এসবের কোনো চিহ্ন নেই। কেবল পাহাড় বেয়ে ওঠার একটি মাটির পথ ও কিছু ধ্বংসাবশেষই অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
দীর্ঘদিন ধরে সিলেট অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক নিদর্শন নিয়ে কাজ করা গবেষক, লেখক ও পরিবেশপ্রেমী আসিফ আযহার বলেন, “ঢুপির মঠ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাস ও সংস্কৃতির জীবন্ত সাক্ষ্য। যথাযথ সংরক্ষণ না হলে আমরা এক অমূল্য ঐতিহ্য চিরতরে হারিয়ে ফেলব। এখনই সরকারি উদ্যোগে প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে এটি সংরক্ষণ করা জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, পাহাড় পরিষ্কার করে জরিপ ও খনন কার্যক্রম পরিচালনা করলে এই মন্দির সম্পর্কে আরও অনেক অজানা ইতিহাস উন্মোচিত হতে পারে।
সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করে সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক, না হলে প্রাচীন এই ঐতিহ্য ধ্বংস হয়ে যাবে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট অবহেলায়।