ঢাকা :
রাজধানীর উত্তরখানে তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির (২৮) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মৃত্যুর কারণ নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে। পরিবারের সন্দেহ, তাঁকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, তাঁর শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌপুলিশ। এর আগের দিন মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার পর তিনি আর ফেরেননি।
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দীপ নামের এক বন্ধু বাসায় এসে তাহসিফকে ডাকেন। মাকে নিচে গিয়ে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে আসার কথা জানিয়ে তিনি বাসা থেকে বের হন। এরপর আর ফিরে আসেননি। ছেলের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে মেনে নিতে পারছেন না তিনি। তাঁর সন্দেহ, তাহসিফকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তবে কারা বা কী কারণে এমন ঘটনা ঘটাতে পারে, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
ঢাকা জেলা নৌপুলিশের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তাহসিফের শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে সুরতহাল প্রতিবেদনে নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়া ও পেট ফোলা থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।
ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক দল। পাশাপাশি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তথ্য সংগ্রহ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
চলতি বছরের ৯ মাসে ৪৩০ মরদেহ উদ্ধার
বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে নৌপুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে ৪৩০টি মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌপুলিশ। এর মধ্যে ১১৬ জনের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। আরও ১০৪ জনের মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।
উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে ঢাকা অঞ্চলে ৭৮টি, বরিশালে ৬৩টি এবং নারায়ণগঞ্জে ৬০টি মরদেহ পাওয়া গেছে। বাকি মরদেহগুলো অন্যান্য এলাকার নদ-নদী থেকে উদ্ধার করা হয়।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে ২ হাজার ৬৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ৬৩৯ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ওই সময়ে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ৩৯২টি হত্যা মামলা হয়েছে।
বিভিন্ন নদীতে মিলছে মরদেহ
তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধারের আগেও দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে একাধিক মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ২৩ অক্টোবর জামালপুরের ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে হাবিবুর রহমান (৫৫) নামে এক ব্যক্তির অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর দুই দিন পর চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদ থেকে জিতু চৌধুরী (৩০) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২৮ অক্টোবর মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে পদ্মা নদ থেকে রাসেল নামে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গাইবান্ধার ঘাঘট নদ থেকেও নিখোঁজ এক প্রকৌশলীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে।
তবে নদী থেকে উদ্ধার হওয়া সব মরদেহই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা বা অন্য কারণে মৃত্যুর ঘটনাও রয়েছে। অন্যদিকে, কিছু ঘটনায় তদন্তে হত্যার প্রমাণ মিলেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ২৯ মে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার ফুলদী নদ থেকে এক তরুণীর মরদেহ উদ্ধারের পর পিবিআইয়ের তদন্তে হত্যাকাণ্ডের তথ্য উঠে আসে। ওই ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। এ ছাড়া গত ২৩ আগস্ট ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদ থেকে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে চারটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে কয়েকটি মরদেহের শরীরে সন্দেহজনক অবস্থার চিহ্ন ছিল এবং ঘটনায় দুটি হত্যা মামলা হয়।
নদীতে মরদেহ ফেলে দেওয়ার কারণ নিয়ে প্রশ্ন
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে হত্যার পর পরিচয় ও অপরাধের আলামত গোপন করতে নদীতে মরদেহ ফেলে দেওয়া হয়। নদীর স্রোতে মরদেহ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে মরদেহে পচন ধরলে পরিচয় শনাক্ত করা এবং মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে তদন্তে জটিলতা তৈরি হয়। নিহত ব্যক্তির সামাজিক সম্পর্ক, সর্বশেষ অবস্থান ও সম্ভাব্য বিরোধের তথ্য পাওয়া না গেলে অপরাধের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমের মতে, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিরোধের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আধিপত্য বিস্তার কিংবা অপরাধীচক্রের দ্বন্দ্বও হত্যাকাণ্ডের কারণ হতে পারে। এসব অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ, নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
নদী থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ঘটনায় পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা হলেও এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করা যায় না।
মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রতিটি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা জরুরি। কোনো মৃত্যুর সঙ্গে অপরাধের সংশ্লিষ্টতা থাকলে নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শনাক্ত করে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সর্বশেষ অবস্থান, মোবাইল ফোনের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং ডিএনএ পরীক্ষার মতো তথ্য সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলে তদন্তে সহায়তা পাওয়া যায়। পাশাপাশি অজ্ঞাত মরদেহের তথ্য সংরক্ষণ ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। তাই তাঁর পরিবারের অভিযোগের পাশাপাশি ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষা ও পুলিশের তদন্তের ফলাফলই এ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন,