Template: 1
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
logo
channeljaintanews24.com
শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৫১ অপরাহ্ন
channeljaintanews24@gmail.com

লীলাপুরী সন্ন্যাসীর কালীমন্দির: জৈন্তিয়ার ইতিহাসের নীরব সাক্ষী

✍ চ্যানেল জৈন্তা নিউজ
🕒 শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৫১ অপরাহ্ন

চিত্র: লীলাপুরী সন্ন্যাসীর কালীমন্দির



জৈন্তাপুরের প্রাচীন জনপদে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রত্ননিদর্শনের অনেকগুলোর পরিচয় আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। নামফলক নেই, নেই পরিচিতির স্পষ্ট চিহ্ন। অথচ ইতিহাসের নানা দলিল, ঐতিহাসিকদের বিবরণ এবং স্থাপত্যের অবশিষ্টাংশ মিলিয়ে এসব নিদর্শনের পরিচয় খুঁজে পাওয়া সম্ভব। নিজপাটে অবস্থিত একটি প্রাচীন কালীমন্দির তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা—যা স্থানীয়ভাবে আজ অনেকের কাছেই প্রায় নামহীন হলেও ঐতিহাসিক সূত্রে এটি লীলাপুরী সন্ন্যাসীর কালীমন্দির হিসেবে চিহ্নিত করার শক্ত ভিত্তি রয়েছে।


জৈন্তিয়ার রাজা দ্বিতীয় বড়গোসাঁইয়ের শাসনামলের সঙ্গে এই মন্দিরের ইতিহাস গভীরভাবে সম্পৃক্ত। প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৭৭০ সালে বড়গোসাঁই সিংহাসন ত্যাগ করে সন্ন্যাসজীবনে প্রবেশ করেন। এ সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি তাম্রশাসনে তাঁর সন্ন্যাস গ্রহণ এবং তাঁর ধর্মগুরু লীলাপুরী সন্ন্যাসীর হাতে একটি মন্দিরের দায়িত্ব অর্পণ ও মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ভূমি দানের তথ্য পাওয়া যায়। জৈন্তিয়ার তাম্রশাসনগুলো রাজবংশের কালপঞ্জি ও ভূমিদানের ইতিহাস পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।


তাম্রশাসনের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৬৯২ শকাব্দে—যা ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত—রাজা বড়গোসাঁই তাঁর ধর্মগুরু শ্রীশ্রী লীলাপুরী স্বামীর কাছ থেকে পরমহংস মন্ত্র গ্রহণ করে সন্ন্যাসজীবনে প্রবেশ করেন এবং ‘শ্রীশ্রীমদ রাজপুরী’ নাম ধারণ করেন। একই দলিলে লীলাপুরীর হাতে একটি মন্দিরের দায়িত্ব অর্পণ এবং মন্দিরের উপাসনা ও সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৯২ কেদার ভূমি দেওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে।


ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, জৈন্তিয়ার রাজা বড়গোসাঁইয়ের সঙ্গে লীলাপুরী সন্ন্যাসীর সম্পর্ক শুধু ধর্মীয় গুরু-শিষ্যের সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ ছিল না; লীলাপুরীর সঙ্গে মন্দির ও ভূমিদানের বিষয়টিও ঐতিহাসিকভাবে নথিভুক্ত হয়েছে। একটি গবেষণাধর্মী ঐতিহাসিক বিবরণে বলা হয়েছে, ১৬৯২ শকাব্দে লীলাপুরী সন্ন্যাসীকে ভূমি দেওয়া হয়েছিল এবং নিজপাটে তাঁর উদ্যোগে একটি বড় কালীমন্দির নির্মিত হয়েছিল, যা উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল।


লীলাপুরী সন্ন্যাসীর কালীমন্দিরের পরিচয় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে জৈন্তিয়ার ইতিহাসবিষয়ক পুরোনো গ্রন্থ ও ঐতিহাসিক বিবরণে। শ্রী অচ্যুতচরণ চৌধুরীর শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত-এ বড়গোসাঁইয়ের সময় নিজপাটে একটি প্রসিদ্ধ কালীমূর্তি প্রতিষ্ঠা এবং তার জন্য প্রাচীরবেষ্টিত সুন্দর ও বৃহৎ মন্দির নির্মাণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে লীলাপুরী নামের এক সন্ন্যাসীকে কালীমূর্তির সেবা-অর্চনার দায়িত্ব দেওয়ার কথাও রয়েছে।


জৈন্তা রাজ্যের ইতিহাসবিষয়ক গবেষণাতেও নিজপাটের এই কালীমন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, লীলাপুরী সন্ন্যাসী নিজপাটে বড় একটি কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং মন্দিরটি উঁচু প্রাচীর দিয়ে বেষ্টিত ছিল। একই সঙ্গে মন্দিরটির সঙ্গে ভূমিদানের সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।


বর্তমানে নিজপাটে টিকে থাকা প্রাচীন স্থাপনাগুলোর মধ্যে এই মন্দিরটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জৈন্তিয়া রাজবাড়ির পশ্চিম পাশে, বর্তমান খেলার মাঠ বা স্টেডিয়ামের দক্ষিণদিকে এর অবস্থান বলে স্থানীয় ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। রাজবাড়ির তুলনামূলক নিচু ভূমির পাশে স্থাপিত মন্দিরটি আশপাশের প্রাচীন স্থাপনার তুলনায় উঁচু হওয়ায় দূর থেকেও এর অবস্থান স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।


মন্দিরটির চারপাশে একসময় যে সীমানাপ্রাচীর ছিল, তার অংশবিশেষ এখনও টিকে আছে। প্রাচীরের ফটকের অস্তিত্বও পুরোনো স্থাপনাটির বেষ্টনী সম্পর্কে ঐতিহাসিক বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে শুধু লোকমুখে প্রচলিত তথ্য নয়, স্থাপনার বর্তমান অবশিষ্টাংশও মন্দিরটির অতীত পরিচয়ের সঙ্গে একটি যোগসূত্র তৈরি করে।


একসময় মন্দিরের গায়ে থাকা একটি প্রস্তরফলকে ‘কালীমন্দির’ লেখা ছিল বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। বর্তমানে সেই প্রস্তরফলকটি আর নেই। মন্দিরের গায়ে কিংবা প্রবেশপথে কোনো পরিচয়ফলক না থাকায় নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই স্থাপনাটি এখন প্রায় নামহীন। কোন রাজা এটি নির্মাণ করেছিলেন—এ প্রশ্নেরও উত্তর অনেকের অজানা।


তবে ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্র একত্র করলে মন্দিরটির পরিচয় সম্পর্কে একটি শক্তিশালী ধারণা পাওয়া যায়। ঐতিহাসিক বর্ণনায় যে ‘প্রাচীরবেষ্টিত সুন্দর ও বৃহৎ মন্দির’-এর কথা বলা হয়েছে, নিজপাটে তার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ স্থাপনাটি হলো এই কালীমন্দির। জৈন্তিয়া রাজবাড়ির ভেতরে থাকা মন্দিরটি তুলনামূলকভাবে ছোট এবং রাজপরিবারের উপাসনালয় হিসেবে বিবেচিত; অন্যদিকে জৈন্তেশ্বরী বাড়ির সঙ্গেও এই বর্ণনা মেলে না।


জৈন্তিয়ার অন্যান্য প্রাচীন মঠ-মন্দির ও ধ্বংসাবশেষের পরিচয়ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে আলাদাভাবে পাওয়া যায়। ফলে বড়গোসাঁইয়ের সময় নির্মিত এবং লীলাপুরী সন্ন্যাসীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সেই ‘প্রাচীরবেষ্টিত সুন্দর ও বৃহৎ’ কালীমন্দিরের সন্ধান করতে গেলে নিজপাটের বর্তমান এই মন্দিরটির সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি মিল পাওয়া যায়।


এই মন্দিরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজা বড়গোসাঁইয়ের সন্ন্যাস গ্রহণের ঘটনাও। তাম্রশাসনে মন্দিরের দায়িত্ব এবং ভূমি প্রদানের যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা থেকে বোঝা যায়—মন্দিরটি শুধু ধর্মীয় উপাসনাস্থল ছিল না; এর নিয়মিত সেবা, উপাসনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট সম্পদের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।


জৈন্তিয়ার ইতিহাসে বড়গোসাঁই দ্বিতীয়ের সময়কাল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রচলিত রাজতালিকা অনুযায়ী তিনি ১৭৩১ থেকে ১৭৭০ সাল পর্যন্ত জৈন্তিয়ার রাজা ছিলেন এবং তাঁর পর ১৭৭০ সালে ছত্র সিংহ সিংহাসনে বসেন।


আজ শত শত বছরের ক্ষয়, অবহেলা ও সময়ের আঘাত পেরিয়ে লীলাপুরী সন্ন্যাসীর কালীমন্দিরটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। ভেঙে যাওয়া প্রাচীর, হারিয়ে যাওয়া নামফলক কিংবা ক্ষয়িষ্ণু স্থাপত্যের মধ্যেও এটি বহন করছে জৈন্তিয়া রাজ্যের ধর্মীয়, সামাজিক ও স্থাপত্য ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।


নিজপাটের এই মন্দির তাই শুধু একটি পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি জৈন্তিয়ার রাজপরিবার, সন্ন্যাসধর্ম, ভূমিদান প্রথা এবং আঠারো শতকের ধর্মীয়-সামাজিক ইতিহাসের একটি জীবন্ত নিদর্শন। সংরক্ষণ ও যথাযথ পরিচিতি নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জৈন্তিয়ার এই হারিয়ে যেতে বসা ইতিহাস আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।

লেখক: আসিফ আযহার:


ছবি
channeljaintanews24.com
logo
ভিজিট করুন
০২.১০.২০২৬
© চ্যানেল জৈন্তা নিউজ — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
channeljaintanews24.com