পঞ্চাশ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত: নামাজ ফরজ হওয়ার ইতিহাস
নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বা‘দ।
প্রশ্ন: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হযরত নবী করীম (সা.)-এর ওপর কখন থেকে ফরজ হয়েছে?
উত্তর: এ বিষয়ে বিভিন্ন মতামত রয়েছে। রদ্দুল মোহতার কিতাবে কোনো কোনো ওলামার রেওয়ায়েতের বরাতে উল্লেখ আছে, হযরত নবী করীম (সা.)-এর হিজরতের দেড় বছর আগে রমজান মাসের ১৭ তারিখ শনিবার রাতে তাঁর ওপর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়।
হাশিয়ায়ে তাহতাবীতে উল্লেখ আছে, কেউ কেউ বলেছেন, রজব মাসে মেরাজের সময় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ তাঁর ওপর ফরজ হয়েছে। অধিকাংশ আলেমের মত এ দিকেই।
শামী কিতাবে আরও উল্লেখ রয়েছে, কারও মতে রজব মাসের ২৭ তারিখ মেরাজের রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন, রবিউল আউয়াল মাসে নামাজ ফরজ হয়েছে।
প্রশ্ন: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার আগে হযরত নবী করীম (সা.) ও তাঁর সাহাবাগণ অন্য কোনো নামাজ পড়তেন কি?
উত্তর: হ্যাঁ। হাশিয়ায়ে তাহতাবী কিতাবে উল্লেখ আছে, সূর্যোদয়ের আগে ও সূর্যাস্তের আগে তাঁরা দুই ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন।
মেরাজের রাতে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত
প্রশ্ন: মেরাজের রাতে হযরত নবী করীম (সা.)-এর ওপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়েছিল। তা কীভাবে পাঁচ ওয়াক্তে পরিণত হলো?
উত্তর: আনিছুল ওয়ায়েজীন নামক কিতাবের বর্ণনার মর্ম অনুযায়ী, মেরাজের রাতে হযরত নবী করীম (সা.) আল্লাহ তায়ালার দরবার থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় হযরত মুসা (আ.)-এর রূহ মোবারকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। হযরত মুসা (আ.) তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি আল্লাহ তায়ালার দরবার থেকে কী নিয়ে এসেছেন।
হযরত নবী করীম (সা.) জানান, আল্লাহ তায়ালা তাঁকে এবং তাঁর উম্মতকে দিবারাত্রে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। এ কথা শুনে হযরত মুসা (আ.) বলেন, তাঁর উম্মত এত বেশি নামাজ আদায় করতে সক্ষম হবে না। তিনি আল্লাহ তায়ালার কাছে নামাজের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়ার আবেদন করতে পরামর্শ দেন।
এরপর হযরত নবী করীম (সা.) আল্লাহ তায়ালার দরবারে ফিরে গিয়ে উম্মতের জন্য নামাজের সংখ্যা কমানোর আবেদন করেন। পর্যায়ক্রমে আল্লাহ তায়ালা নামাজের সংখ্যা কমিয়ে দেন।
বর্ণিত কাহিনি অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। হযরত মুসা (আ.) আরও কমানোর জন্য পরামর্শ দিলেও হযরত নবী করীম (সা.) বলেন, তিনি আর আল্লাহ তায়ালার কাছে এ বিষয়ে আবেদন করতে লজ্জাবোধ করছেন।
এরপর আল্লাহ তায়ালা তাঁর উম্মতের প্রতি বিশেষ রহমত করে ঘোষণা করেন—উম্মত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথভাবে আদায় করলে পাঁচ ওয়াক্তের বিনিময়ে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সওয়াব প্রদান করা হবে।
অতএব, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রত্যেক মুসলমানের উচিত নামাজ যথাসময়ে ও নিয়ম মেনে আদায় করা এবং নিজের স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজনসহ সবাইকে নামাজ আদায়ে উৎসাহিত করা।
পূর্ববর্তী নবীদের ওপর নামাজ
প্রশ্ন: হযরত নবী করীম (সা.)-এর পূর্ববর্তী নবীদের কারও ওপর কি নামাজ ফরজ ছিল?
উত্তর: আনিছুল ওয়ায়েজীন কিতাবের বর্ণনার মর্ম অনুযায়ী, পূর্ববর্তী নবীদের কারও ওপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত, কারও ওপর চল্লিশ ওয়াক্ত, কারও ওপর বিশ ওয়াক্ত এবং কারও ওপর দশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ ছিল। এমন কোনো নবী ছিলেন না, যাঁর ওপর পঞ্চাশের বেশি বা দশ ওয়াক্তের কম নামাজ ফরজ ছিল—এমন বর্ণনা সেখানে পাওয়া যায়।
শিশুদের নামাজ শিক্ষা
প্রশ্ন: নামাজ ফরজ হয় বালেগ নারী-পুরুষের ওপর। তাহলে বালক-বালিকাদের নামাজ পড়ার জন্য কেন নির্দেশ দেওয়া হয়?
উত্তর: হাশিয়ায়ে তাহতাবী কিতাবে উল্লেখ আছে, নাবালকের ওপর নামাজ ও রোজা ফরজ নয়। তবে পিতা-মাতার দায়িত্ব হলো সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই নামাজ-রোজাসহ ইসলামের প্রয়োজনীয় বিধিবিধান শিক্ষা দেওয়া।
হযরত নবী করীম (সা.)-এর একটি হাদিসের মর্মার্থ হলো—সন্তানের বয়স সাত বছর হলে তাকে নামাজের নির্দেশ দিতে হবে। দশ বছর বয়সে পৌঁছানোর পরও নামাজে অবহেলা করলে শাসনের মাধ্যমে নামাজের প্রতি অভ্যস্ত করতে হবে।
শামী ও হাশিয়ায়ে তাহতাবী কিতাবে শিশুদের শাসনের বিষয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সন্তানদের সংশোধনের উদ্দেশ্যে শাসনের ক্ষেত্রেও সীমালঙ্ঘন না করা এবং কোমলতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে শিক্ষা দেওয়া জরুরি।
নামাজ পরিত্যাগের বিষয়ে সতর্কতা
প্রশ্ন: বালেগ নারী-পুরুষ নামাজ ও রোজা ত্যাগ করলে তাদের বিষয়ে কী বিধান?
উত্তর: শামী কিতাবে নামাজকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে কঠোর সতর্কতা বর্ণিত হয়েছে। ইসলামের মৌলিক বিধান হিসেবে নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম। ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ পরিত্যাগ করা অত্যন্ত গুরুতর গুনাহ।
লেখক উল্লেখ করেছেন, হযরত নবী করীম (সা.)-এর হাদিসের মর্মার্থ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে অন্যায় কাজে লিপ্ত হতে দেখলে সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে; তা সম্ভব না হলে মুখে উপদেশ দিতে হবে এবং সেটিও সম্ভব না হলে অন্তরে ওই কাজকে অপছন্দ করতে হবে।
সুতরাং প্রত্যেক মুসলমানের উচিত নামাজের গুরুত্ব অনুধাবন করা, নিজে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা এবং পরিবার ও সন্তানদের নামাজের প্রতি উৎসাহিত করা।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে নামাজের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসায়েল জানার এবং সঠিকভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক:
হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট।
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট।
সাবেক ইমাম ও খতীব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট।
সাবেক প্রিন্সিপাল, হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেট।
সাবেক প্রধান শিক্ষক, হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া দাখিল মাদ্রাসা, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট।