বিনোদন ডেস্ক: বাংলা চলচ্চিত্রের নব্বইয়ের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ। মাত্র কয়েক বছরের অভিনয়জীবনে নিজের অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও স্বতন্ত্র ফ্যাশন স্টাইল দিয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন অসংখ্য দর্শকের হৃদয়ে। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু চলচ্চিত্রাঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি করেছিল, তিন দশক পেরিয়েও তা পূরণ হয়নি।
আজ রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সালমান শাহর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী। প্রিয় এই নায়কের স্মরণে দেশের চলচ্চিত্রাঙ্গন ও বিভিন্ন মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে নানা আয়োজন।
সালমান শাহর প্রকৃত নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের আগে টেলিভিশন নাটক, মিউজিক ভিডিও ও বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করেন।
১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় নায়ক হিসেবে অভিষেক হয় তাঁর। বিপরীতে ছিলেন মৌসুমী। প্রথম সিনেমাতেই দর্শকদের ব্যাপক সাড়া পান সালমান শাহ। এরপর একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমায় অভিনয় করে দ্রুতই হয়ে ওঠেন ঢালিউডের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা।
‘অন্তরে অন্তরে’, ‘দেনমোহর’, ‘তোমাকে চাই’, ‘বিক্ষোভ’, ‘বিচার হবে’, ‘চাঁদ থেকে পাওয়া’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘জীবন সংসার’, ‘মহা মিলন’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘মায়ের অধিকার’, ‘সত্যের মৃত্যু নাই’, ‘সুজন সখী’, ‘তুমি আমার’, ‘প্রিয়জন’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘প্রেম পিয়াসী’ ও ‘বুকের ভিতর আগুন’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন তিনি।
স্বল্প সময়ের ক্যারিয়ারে ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন সালমান শাহ। শাবনূরের সঙ্গে তাঁর জুটি দর্শকদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। তাঁদের অভিনীত একাধিক সিনেমা বাণিজ্যিকভাবে সফল হয় এবং নব্বইয়ের দশকের চলচ্চিত্রে এই জুটি আলাদা পরিচিতি লাভ করে।
অভিনয়ের পাশাপাশি ফ্যাশনেও ছিলেন অনন্য
সালমান শাহ শুধু অভিনয়ের জন্যই জনপ্রিয় ছিলেন না; তাঁর পোশাক, চুলের স্টাইল, কথা বলার ধরন ও পর্দায় উপস্থাপনার নিজস্বতা তাঁকে সমসাময়িক অন্য নায়কদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
নব্বইয়ের দশকের তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁর ফ্যাশন ও স্টাইল হয়ে উঠেছিল অনুকরণের বিষয়। তাঁর সিনেমার গান, সংলাপ ও চরিত্রের সঙ্গে দর্শকের এক ধরনের আবেগের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।
যে সকাল বদলে দেয় সবকিছু
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার নিউ ইস্কাটনের বাসায় অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় সালমান শাহকে। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে চলচ্চিত্রাঙ্গন ও ভক্তদের মধ্যে নেমে আসে গভীর শোক।
তবে মৃত্যুর পর থেকেই তাঁর মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের সূত্রপাত হয়। প্রথমে এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে মৃত্যুর ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্তের দাবি জানানো হয়।
দীর্ঘ সময় ধরে সালমান শাহর মৃত্যুর কারণ নিয়ে আলোচনা ও আইনি প্রক্রিয়া চলেছে। পূর্ববর্তী তদন্তে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পরিবারের পক্ষ থেকে তা প্রত্যাখ্যান করে হত্যার অভিযোগ তোলা হয়। এ কারণে তাঁর মৃত্যু দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনা হিসেবে থেকে গেছে।
তিন দশকেও কমেনি জনপ্রিয়তা
সালমান শাহর মৃত্যুর তিন দশক পরও তাঁর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। বরং নতুন প্রজন্মের কাছেও তাঁর সিনেমা ও গান জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত তাঁর ছবি, সিনেমার দৃশ্য ও গান নিয়ে আলোচনা হয়।
তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো এখনো দর্শকের কাছে নব্বইয়ের দশকের স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ফলে সময় পেরোলেও সালমান শাহ যেন হারিয়ে যাননি; বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তাঁর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে।
মৃত্যুবার্ষিকীতে বিশেষ আয়োজন
সালমান শাহর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন মাধ্যমে বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) তিন দিনব্যাপী উন্মুক্ত চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে।
এ ছাড়া দীপ্ত টিভিও তাঁর স্মরণে সাত দিনব্যাপী বিশেষ আয়োজন করেছে। ৫ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে সালমান শাহ অভিনীত সাতটি চলচ্চিত্র প্রচারের কথা জানানো হয়েছে।
চলচ্চিত্রপ্রেমীরা বলছেন, সালমান শাহর মতো তারকা খুব অল্প সময়ের মধ্যে যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, তা এখনো বিরল। তাঁর চলে যাওয়ার তিন দশক পরও দর্শকের ভালোবাসা প্রমাণ করে—কিছু শিল্পীর জনপ্রিয়তা সময়ের সঙ্গে শেষ হয় না।
সালমান শাহ আজ নেই। কিন্তু তাঁর অভিনীত সিনেমা, গান, সংলাপ ও স্মৃতি এখনো বেঁচে আছে দর্শকের হৃদয়ে। তাই তিন দশক পরও তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকদের কাছে একইভাবে প্রিয়—একজন স্বপ্নের নায়ক, যাঁর পর্দার আলো আজও ম্লান হয়নি।