মো. জুনেদ আহমদ, ফ্রান্স থেকে:
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ টেক্সটাইল ও পোশাক প্রদর্শনী Texworld Apparel Sourcing Paris 2026-এ শক্তিশালী উপস্থিতি জানান দিয়েছে বাংলাদেশ। প্যারিসের Paris-Le Bourget Exhibition Centre-এ ৩১ আগস্ট শুরু হওয়া এ আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী চলবে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এবারের আয়োজনে প্রায় ৩৫টি দেশের ১ হাজার ৩০০ নির্মাতা ও সরবরাহকারী অংশ নিচ্ছেন।
এ প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের ১৭টি প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য নিয়ে অংশ নিয়েছে। বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণকে ইউরোপের বাজারে নতুন ক্রেতা, আমদানিকারক, ফ্যাশন ব্র্যান্ড ও ব্যবসায়িক অংশীদার খোঁজার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান তৈরি পোশাক সরবরাহকারী দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক সোর্সিং প্ল্যাটফর্মে দেশের এ উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
মেসে ফ্রাঙ্কফুর্টের তথ্য অনুযায়ী, Texworld Apparel Sourcing Paris ইউরোপের অন্যতম বড় টেক্সটাইল ও পোশাক সোর্সিং প্ল্যাটফর্ম। এখানে কাপড়, কাঁচামাল, তৈরি পোশাক, ফ্যাশন অ্যাকসেসরিজসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক নির্মাতা ও সরবরাহকারীরা অংশ নেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পেশাদার ক্রেতারা এ প্রদর্শনীতে এসে নতুন পণ্য ও সরবরাহকারী খুঁজে নেওয়ার সুযোগ পান।
বাংলাদেশের ১৭ অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ১২টি প্রতিষ্ঠান রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB)-এর প্যাভিলিয়নের মাধ্যমে মেলায় অংশ নিচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে—Comoda Garments, Skylark Knit Composite, Norban Comtex, Warptex, BNM Garments Industry, Fabitex Industries, DK Textile, Fabrica Knit Composite, Ducati Apparels, Corus Fashion, Bengal Glory ও SIM Fabrics।
এ ছাড়া Texworld ও Apparel Sourcing-এর পৃথক বিভাগেও বাংলাদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। Hoorain High Tech (HTF), NZ Denim ও NZ Fabric Texworld বিভাগে এবং Nexgen Apparel ও H&F Fashion Apparel Sourcing বিভাগে অংশগ্রহণ করছে।
মেলায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা শুধু পণ্য প্রদর্শনের মধ্যেই নিজেদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখছেন না। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, নতুন অর্ডারের সম্ভাবনা তৈরি, ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ইউরোপের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার খোঁজার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
বর্তমান বৈশ্বিক পোশাকবাজারে শুধু প্রতিযোগিতামূলক দাম নয়, পণ্যের মান, বৈচিত্র্য, দ্রুত সরবরাহ, উৎপাদন সক্ষমতা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থাও ক্রেতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলাগুলো বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরার পাশাপাশি নতুন বাজারের চাহিদা বোঝার সুযোগও তৈরি করছে।
তবে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান কিছুটা চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমে ৮ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে। একই সময়ে ইইউর সামগ্রিক পোশাক আমদানিও ৯ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইইউতে বাংলাদেশি পোশাকের রপ্তানি পরিমাণও ৮ দশমিক ২২ শতাংশ কমেছে এবং গড় রপ্তানি মূল্য কমেছে ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ। তবে জুন মাসে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়েছে, যদিও মূল্যমানের হিসাবে সামান্য পতন হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের অবস্থান ধরে রাখতে নতুন ক্রেতা ও ব্যবসায়িক অংশীদার খোঁজার পাশাপাশি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সরাসরি ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে বৈশ্বিক ফ্যাশন ও পোশাক শিল্পের পরিবর্তিত চাহিদা, নতুন ডিজাইন, উৎপাদন প্রযুক্তি এবং টেকসই উৎপাদনের প্রবণতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ফলে এ ধরনের আয়োজন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য শুধু পণ্য প্রদর্শনের জায়গা নয়, বরং বাজার সম্প্রসারণ ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক কৌশল নির্ধারণেরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
প্যারিসের এই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের ১৭টি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ তাই ইউরোপের বাজারে নতুন ক্রেতা ও ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের সক্ষমতা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্যারিস থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্যের এই উপস্থিতি ‘Made in Bangladesh’ ব্র্যান্ডকে আরও বৈচিত্র্যময়, মানসম্মত ও প্রতিযোগিতামূলক হিসেবে তুলে ধরার নতুন সুযোগ তৈরি করছে।