নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সিলেটের মহাসড়কে ত্রি-হুইলার, বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি
সিলেট প্রতিনিধি: নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সিলেটের মহাসড়কগুলোতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, টমটমসহ বিভিন্ন ধরনের ত্রি-হুইলার। মহাসড়কে এসব ধীরগতির যানবাহনের অবাধ চলাচল, যত্রতত্র স্ট্যান্ড ও যাত্রী ওঠানামার কারণে দুর্ঘটনার পাশাপাশি যানজটও বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সর্বশেষ গত ২২ আগস্ট সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগরে তেলবাহী ট্যাংকলরি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে একই পরিবারের তিনজনসহ চারজন নিহত হন। গুরুতর আহত হন আরও কয়েকজন। শেরপুর হাইওয়ে থানার ওসি মো. আনিসুর রহমান দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এর আগে ৯ আগস্ট ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার বেজুরা এলাকায় তেলবাহী লরি, বালুবাহী ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার ত্রিমুখী সংঘর্ষে দুইজন নিহত হন। দুর্ঘটনার পর মহাসড়কে প্রায় আড়াই ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল।
মহাসড়কজুড়ে ত্রি-হুইলারের অবাধ চলাচল
সম্প্রতি সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দয়ামীর, চণ্ডীপুল থেকে শেরপুর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও টমটম অবাধে চলাচল করছে। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে এসব যানবাহনের স্ট্যান্ড। কোথাও কোথাও মহাসড়কের ওপরই সারিবদ্ধভাবে ২০ থেকে ৫০টি পর্যন্ত ত্রি-হুইলার দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সেখানেই যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছে।
তাজপুর, গোয়ালাবাজারসহ কয়েকটি বাজার এলাকায় মহাসড়কের ওপর গড়ে ওঠা সিএনজি স্ট্যান্ডের কারণে যানজটও সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে মহাসড়কে দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে ধীরগতির ত্রি-হুইলারের সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে।
শুধু সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক নয়, সিলেট-তামাবিল, সিলেট-সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়কেও সিএনজিচালিত অটোরিকশা, টমটমসহ বিভিন্ন ত্রি-হুইলার চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কেন বন্ধ হচ্ছে না?
জাতীয় মহাসড়কে ত্রি-হুইলার চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা নতুন নয়। ২০১৫ সালে দেশের ২২টি জাতীয় মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, অটোটেম্পো ও অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। ওই তালিকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাঁচপুর থেকে শেরপুর-সিলেট বাইপাস পর্যন্ত অংশও রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই জারি করা প্রজ্ঞাপনে সড়ক নিরাপত্তার স্বার্থে ১ আগস্ট থেকে দেশের জাতীয় মহাসড়কে থ্রি-হুইলার অটোরিকশা ও সব ধরনের অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করার কথা জানানো হয়েছিল।
কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই নিষেধাজ্ঞার কার্যকর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সিলেটের মহাসড়কেও নিয়মিতভাবে এসব যান চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে।
চালকদের অভিযোগ, ‘মাসোহারা’ দিয়ে চলে অটোরিকশা
মহাসড়কে চলাচলকারী কয়েকজন সিএনজি অটোরিকশাচালকের দাবি, বিভিন্ন অটোরিকশা সমিতির মাধ্যমে পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দেওয়ার বিনিময়ে মহাসড়কে গাড়ি চালানোর সুযোগ পাওয়া যায়। তবে এই অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
চালকদের ভাষ্য, নির্দিষ্ট সমিতির সঙ্গে যুক্ত অটোরিকশাগুলো তুলনামূলকভাবে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। অন্যদিকে সমিতির বাইরে থাকা গাড়ির বিরুদ্ধে অনেক ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও পরিবহন সমিতির বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর বার্তার পরও প্রশ্ন
গত ১৮ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মহাসড়কে কোনো ধরনের থ্রি-হুইলার চলতে দেওয়া হবে না। তিনি জানান, এসব যান কেবল স্থানীয় বাজার, ফিলিং স্টেশন ও ফিডার রোডে চলাচল করতে পারবে। মহাসড়কে উঠলে সংশ্লিষ্ট যান ও চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মহাসড়কে আইনভঙ্গ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে এআই ক্যামেরা ব্যবহারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চালু হওয়া ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য মহাসড়কেও চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
‘নিয়মিত অভিযান চালাই’
মহাসড়কে ত্রি-হুইলার চলাচল বন্ধে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও শেরপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিসুর রহমান বলেছেন, তারা নিয়মিত অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাঁর ভাষ্য, সারাদেশেই এ ধরনের সমস্যা রয়েছে এবং কার্যক্রম অব্যাহত রাখলে একসময় পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
তবে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা ও মহাসড়কের মাঠচিত্র বলছে, নিষেধাজ্ঞা ও নিয়মিত অভিযানের পরও সিলেটের মহাসড়কে ত্রি-হুইলারের অবাধ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে আরও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ কবে নেওয়া হবে?
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই হবে না; মহাসড়কে ত্রি-হুইলারের প্রবেশ বন্ধ, অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের জন্য বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করাও কঠিন হবে।