Template: 3
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
২৩ আগস্ট ২০২৬ · ০৪:৪৪ অপরাহ্ন

১২ দলইর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল জৈন্তিয়ার পাহাড়ি সমাজ: সিন্টেং জনগোষ্ঠীর ইতিহাসের খোঁজে আসিফ আযহার

চ্যানেল জৈন্তা নিউজ
ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক


সিলেট ও ভারতের মেঘালয়জুড়ে বিস্তৃত জৈন্তিয়া অঞ্চলের ইতিহাসে সিন্টেং বা জৈন্তিয়া জনগোষ্ঠীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ি সমাজের সামাজিক সংগঠন, প্রশাসনিক কাঠামো, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং পরবর্তীতে জৈন্তিয়া রাজ্যের সঙ্গে পাহাড় ও সমতলের রাজনৈতিক সম্পর্ক—সবকিছুর সঙ্গেই এই জনগোষ্ঠীর ইতিহাস নিবিড়ভাবে যুক্ত।


গবেষক ও লেখক আসিফ আযহারের ‘জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন’ গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায় ‘সিন্টেং বা জৈন্তিয়া জনগোষ্ঠীর কথা’-তে এই জনগোষ্ঠীর উৎপত্তি, সামাজিক বিকাশ, প্রশাসনিক কাঠামো এবং জৈন্তিয়া রাজ্যের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বইটি ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট Internet Archive-এ আসিফ আযহারের নামে প্রকাশিত হয়েছে।


সিন্টেং নামের উৎপত্তি নিয়ে গবেষকদের ভিন্ন মত


পুরাতত্ত্ববিদ রাজমোহন নাথের মত উদ্ধৃত করে আসিফ আযহার লিখেছেন, জৈন্তিয়া পাহাড়ের অধিবাসী সিন্টেংরা আদি ‘সিন’ বা Tsin বংশের লোক এবং তাদের আদি বাসভূমির নাম ছিল Teing। Tsin ও Teing শব্দের সমন্বয়ে Tsinteing বা Synteng শব্দের উদ্ভব এবং পরবর্তীতে সেখান থেকেই ‘জৈন্তিয়া’, ‘জয়ন্তীয়া’ বা ‘জৈন্তা’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।


তবে নামের উৎপত্তি নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত। সাম্প্রতিক একটি গবেষণামূলক আলোচনায় ‘Synteng’ শব্দকে জৈন্তিয়া জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করা হলেও ‘Jaintia’ নামের উৎপত্তি নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।


রাজমোহন নাথ ছিলেন ভারতীয় লেখক ও নৃবিজ্ঞানী। তাঁর The Back-ground of Assamese Culture গ্রন্থে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও সংস্কৃতি নিয়ে ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক আলোচনা রয়েছে।


লাংদহ ছিলেন একই সঙ্গে ধর্মযাজক, বিচারক ও প্রশাসক


আসিফ আযহারের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রাচীন সময়ে জৈন্তিয়া পাহাড়ে সিন্টেংদের বসতি ছিল তুলনামূলকভাবে কম এবং সমাজব্যবস্থাও ছিল সরল। প্রতিটি বসতি একজন সিন্টেং প্রধানের অধীনে পরিচালিত হতো। এই প্রধানকে বলা হতো ‘লাংদহ’।


লাংদহ একই সঙ্গে ধর্মযাজক, বিচারক ও প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করতেন। বসতির মানুষ তার সিদ্ধান্ত মেনে চলত এবং বসতিগুলো ছিল অনেকটাই স্বাধীন। ফলে একজন লাংদহের ওপর অন্য কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব ছিল না।


পরবর্তীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সিন্টেং সমাজের কাঠামোও পরিবর্তিত হতে থাকে। বিভিন্ন পরিবার ও গোষ্ঠী বা ‘কুর’-এর সমন্বয়ে বড় বসতি বা ‘ক্নং’ গড়ে ওঠে। কয়েকটি ক্নং নিয়ে তৈরি হয় ‘রাইদ’ এবং কয়েকটি রাইদ মিলে গঠিত হয় একটি ‘এলাকা’ বা পুঞ্জি।


এই সামাজিক কাঠামোর বিবরণ আধুনিক গবেষণাতেও পাওয়া যায়। একটি গবেষণামূলক পর্যালোচনায় পরিবার, উপগোষ্ঠী, কুর বা ক্ল্যান, গ্রাম, রাইদ এবং এলাকা—এভাবে ধাপে ধাপে জৈন্তিয়া সমাজের রাজনৈতিক সংগঠন বিকশিত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।


১২ পুঞ্জি ও ১২ দলই


আসিফ আযহারের গবেষণা অনুযায়ী, সিন্টেং সমাজে মোট ১২টি এলাকা বা পুঞ্জি গড়ে ওঠে। প্রতিটি পুঞ্জির প্রধান বা সরদারকে বলা হতো ‘দলই’। এই দলইরা ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী। পুরো সিন্টেং সমাজের নেতৃত্ব মূলত ১২ দলইর হাতেই কেন্দ্রীভূত ছিল।


সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে আরও সুসংগঠিত করতে দলইরা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে প্রধান হিসেবে নির্বাচন করতেন। তাঁর উপাধি ছিল ‘সিয়েম’। ১২টি পুঞ্জি সিয়েমের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হলে সেই রাজনৈতিক সংগঠনকে বলা হতো ‘হিমা’।


সাধারণত সুতংগা পুঞ্জির দলইকে হিমার সিয়েম নির্বাচিত করা হতো বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।


জৈন্তিয়া পাহাড়কে ‘১২ দলইর দেশ’ হিসেবে দেখার ঐতিহাসিক ধারণার সঙ্গে এ তথ্যের মিল রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় জৈন্তিয়া পাহাড়ে ১২টি ডলোইশিপ বা প্রশাসনিক এককের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব এলাকার সংখ্যা ও নাম নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে কিছু পার্থক্য রয়েছে।


সমতলে সিয়েমের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা


আসিফ আযহারের গবেষণায় বলা হয়েছে, আনুমানিক ১৫০০ সালের কাছাকাছি সময়ে সুতংগা পুঞ্জির দলই এবং হিমার সিয়েম মানগোসাঁই বা বড়গোসাঁই জৈন্তিয়া সমভূমির কর্তৃত্ব লাভ করেন। এর মাধ্যমে তিনি সমতলের রাজা হিসেবে আবির্ভূত হন এবং নতুন সিন্টেং রাজবংশের সূচনা করেন বলে লেখক উল্লেখ করেছেন।


হিমার সিয়েম এবং সমতলের রাজা একই ব্যক্তি হওয়ায় জৈন্তিয়া পাহাড় ও সমভূমির মধ্যে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে সিন্টেং সমাজে প্রথম দিকের এই শাসকদের শুধু হিমার সিয়েম হিসেবেই গ্রহণ করা হতো; তারা সমতলের ‘রাজা’ হিসেবে পুরোপুরি স্বীকৃত ছিলেন না বলে লেখকের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।


রাজা যশোমাণিকের সময় থেকে সিন্টেং দলইরা রাজদরবারে অংশ নিতে শুরু করেন বলে ধারণা করা হয়। এরপর হিমার সিয়েম সিন্টেংদের কাছেও রাজা হিসেবে স্বীকৃতি পান। দলইরা সিয়েমকে রাজা হিসেবে মেনে নেওয়ার পর ১২টি পাহাড়ি পুঞ্জিও জৈন্তিয়া রাজ্যের ‘রাজ’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।


স্বায়ত্তশাসিত ছিল ১২ পাহাড়ি রাজ


জৈন্তিয়া রাজ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও ১২টি পাহাড়ি এলাকা পুরোপুরি কেন্দ্রীয় শাসনের অধীন ছিল না। আসিফ আযহারের বর্ণনা অনুযায়ী, এগুলো ছিল অনেকটাই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল।


সিন্টেং দলইরা নিজ নিজ এলাকার স্বাধীন সরদার হিসেবে প্রশাসন পরিচালনা করতেন। তাদের নিজস্ব অর্থবল ও লোকবল ছিল। তারা মৌখিকভাবে রাজার আনুগত্য স্বীকার করতেন এবং প্রয়োজনের সময় রাজ্যের প্রতিরক্ষায় রাজাকে সহায়তা করতেন।


তাদের কাছ থেকে নিয়মিত কর আদায় করা হতো না। বরং আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিবছর রাজাকে একটি করে বলির পাঁঠা উপহার দেওয়ার রীতি ছিল বলে গ্রন্থটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। শারদীয় উৎসবের সময় ১২টি এলাকা থেকে ১২টি পাঁঠা রাজার কাছে পাঠানো হতো।


গবেষকের মতে, এই উপহার ছিল শুধু আনুগত্যের প্রতীক নয়; এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কও জড়িত ছিল। বহিরাগত শক্তির আক্রমণ থেকে জৈন্তিয়া রাজ্যকে রক্ষায় পাহাড়ি দলইদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে তিনি মনে করেন।


ঐতিহাসিক গবেষণাতেও জৈন্তিয়ার ডলোইরা শক্তিশালী স্থানীয় প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাদের কেউ কেউ সিয়েমের মন্ত্রী, দূত এবং নিজ নিজ এলাকার প্রশাসনিক প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন।


১২ পুঞ্জির নাম নিয়ে ঐতিহাসিকদের মতপার্থক্য


জৈন্তিয়া পাহাড়ের ১২টি পুঞ্জি বা প্রশাসনিক এলাকার নাম নিয়ে বিভিন্ন গ্রন্থে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। আসিফ আযহারের বইয়ে তিনটি আলাদা সূত্রের তালিকা পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে।


মোহাম্মদ আবদুল আজিজের ‘জৈন্তা রাজ্যের ইতিহাস’ অনুযায়ী:

সুতংগা, নরতিয়াং, নাথেলাং, নারপুহ, নংজিনি, নংবারেহ, লখডং, সাংপুং, ময়সু, জোয়াই, রাম্ভাই ও গোভা।


সৈয়দ মুর্তাজা আলীর ‘History of Jaintia’ অনুযায়ী:

Suhtnga, Nartiang, Natelang, Norpuh, Nongjhini, Nongbare, Lakhdong, Shangpung, Myuso, Jawai, Raliang ও Rambhai।


অধ্যাপক রাভি পুভাইয়ার তালিকা অনুযায়ী:

Sutnga, Nartiang, Nongtalang, Nangphyllut, Nongjngi, Nangbah, Lakadong, Shangpung, Mynso, Jowai, Raliang ও Amwi।


এই পার্থক্যকে ইতিহাসের অসঙ্গতি হিসেবে দেখার পরিবর্তে বিভিন্ন সময়ের প্রশাসনিক নাম, স্থানীয় উচ্চারণ, বানান এবং গবেষকদের ব্যবহৃত নামের ভিন্নতা হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন। গবেষণায় জৈন্তিয়া পাহাড়ে ১২টি ডলোইশিপের অস্তিত্বের কথা বিভিন্নভাবে নথিবদ্ধ হয়েছে। সৈয়দ মুর্তাজা আলীর তালিকাতেও Sutnga, Nartiang, Jowai, Nongjngi, Shangpung, Raliang, Mynso, Nongtalang, Rymbai, Lakadong, Nongbareh ও Narpuh-এর উল্লেখ পাওয়া যায়।


জৈন্তিয়া ইতিহাসে সিন্টেংদের গুরুত্ব


জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে সিন্টেং জনগোষ্ঠীর গুরুত্ব এখানেই যে, তারা শুধু একটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠী হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না; সময়ের সঙ্গে তাদের সামাজিক সংগঠন একটি সুসংবদ্ধ রাজনৈতিক কাঠামোতে রূপ নেয়। লাংদহ থেকে দলই, দলই থেকে সিয়েম এবং সিয়েমের নেতৃত্বে হিমা—এই ধারায় তাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে বলে আসিফ আযহারের গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে।


পরবর্তীতে হিমার সিয়েম যখন জৈন্তিয়া সমভূমির রাজা হিসেবে আবির্ভূত হন, তখন পাহাড় ও সমতলের মধ্যে যে রাজনৈতিক সংযোগ তৈরি হয়, সেটিই জৈন্তিয়া রাজ্যের পরবর্তী শক্তির অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।


গবেষণায় দেখা যায়, জৈন্তিয়া সমাজের রাজনৈতিক কাঠামো ছিল প্রচলিত রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন, দলইদের ক্ষমতা এবং সিয়েমের নেতৃত্ব—এই তিন স্তরের সমন্বয়ে একটি বিশেষ ধরনের শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। জৈন্তিয়া পাহাড়কে ঐতিহাসিকভাবে ১২ ডলোইর ভূখণ্ড হিসেবে উল্লেখ করার প্রবণতাও এই কাঠামোর গুরুত্বকে নির্দেশ করে।


‘জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন’ গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়ে আসিফ আযহার মূলত সেই সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনের ইতিহাস অনুসন্ধান করেছেন—যে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি বসতি থেকে সিন্টেং সমাজ একটি সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয় এবং শেষ পর্যন্ত জৈন্তিয়া রাজ্যের পাহাড় ও সমতলের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।


বই: জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন

অধ্যায়: ৪ — সিন্টেং বা জৈন্তিয়া জনগোষ্ঠীর কথা

লেখক: আসিফ আযহার


"Internet Archive-এ ‘জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন’ বইটি পড়ুন/ডাউনলোড করুন" (https://reference-url-citation.invalid/9)

নিজস্ব প্রতিবেদক


সিলেট ও ভারতের মেঘালয়জুড়ে বিস্তৃত জৈন্তিয়া অঞ্চলের ইতিহাসে সিন্টেং বা জৈন্তিয়া জনগোষ্ঠীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ি সমাজের সামাজিক সংগঠন, প্রশাসনিক কাঠামো, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং পরবর্তীতে জৈন্তিয়া রাজ্যের সঙ্গে পাহাড় ও সমতলের রাজনৈতিক সম্পর্ক—সবকিছুর সঙ্গেই এই জনগোষ্ঠীর ইতিহাস নিবিড়ভাবে যুক্ত।


গবেষক ও লেখক আসিফ আযহারের ‘জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন’ গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায় ‘সিন্টেং বা জৈন্তিয়া জনগোষ্ঠীর কথা’-তে এই জনগোষ্ঠীর উৎপত্তি, সামাজিক বিকাশ, প্রশাসনিক কাঠামো এবং জৈন্তিয়া রাজ্যের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বইটি ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট Internet Archive-এ আসিফ আযহারের নামে প্রকাশিত হয়েছে।


সিন্টেং নামের উৎপত্তি নিয়ে গবেষকদের ভিন্ন মত


পুরাতত্ত্ববিদ রাজমোহন নাথের মত উদ্ধৃত করে আসিফ আযহার লিখেছেন, জৈন্তিয়া পাহাড়ের অধিবাসী সিন্টেংরা আদি ‘সিন’ বা Tsin বংশের লোক এবং তাদের আদি বাসভূমির নাম ছিল Teing। Tsin ও Teing শব্দের সমন্বয়ে Tsinteing বা Synteng শব্দের উদ্ভব এবং পরবর্তীতে সেখান থেকেই ‘জৈন্তিয়া’, ‘জয়ন্তীয়া’ বা ‘জৈন্তা’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।


তবে নামের উৎপত্তি নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত। সাম্প্রতিক একটি গবেষণামূলক আলোচনায় ‘Synteng’ শব্দকে জৈন্তিয়া জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করা হলেও ‘Jaintia’ নামের উৎপত্তি নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।


রাজমোহন নাথ ছিলেন ভারতীয় লেখক ও নৃবিজ্ঞানী। তাঁর The Back-ground of Assamese Culture গ্রন্থে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও সংস্কৃতি নিয়ে ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক আলোচনা রয়েছে।


লাংদহ ছিলেন একই সঙ্গে ধর্মযাজক, বিচারক ও প্রশাসক


আসিফ আযহারের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রাচীন সময়ে জৈন্তিয়া পাহাড়ে সিন্টেংদের বসতি ছিল তুলনামূলকভাবে কম এবং সমাজব্যবস্থাও ছিল সরল। প্রতিটি বসতি একজন সিন্টেং প্রধানের অধীনে পরিচালিত হতো। এই প্রধানকে বলা হতো ‘লাংদহ’।


লাংদহ একই সঙ্গে ধর্মযাজক, বিচারক ও প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করতেন। বসতির মানুষ তার সিদ্ধান্ত মেনে চলত এবং বসতিগুলো ছিল অনেকটাই স্বাধীন। ফলে একজন লাংদহের ওপর অন্য কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব ছিল না।


পরবর্তীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সিন্টেং সমাজের কাঠামোও পরিবর্তিত হতে থাকে। বিভিন্ন পরিবার ও গোষ্ঠী বা ‘কুর’-এর সমন্বয়ে বড় বসতি বা ‘ক্নং’ গড়ে ওঠে। কয়েকটি ক্নং নিয়ে তৈরি হয় ‘রাইদ’ এবং কয়েকটি রাইদ মিলে গঠিত হয় একটি ‘এলাকা’ বা পুঞ্জি।


এই সামাজিক কাঠামোর বিবরণ আধুনিক গবেষণাতেও পাওয়া যায়। একটি গবেষণামূলক পর্যালোচনায় পরিবার, উপগোষ্ঠী, কুর বা ক্ল্যান, গ্রাম, রাইদ এবং এলাকা—এভাবে ধাপে ধাপে জৈন্তিয়া সমাজের রাজনৈতিক সংগঠন বিকশিত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।


১২ পুঞ্জি ও ১২ দলই


আসিফ আযহারের গবেষণা অনুযায়ী, সিন্টেং সমাজে মোট ১২টি এলাকা বা পুঞ্জি গড়ে ওঠে। প্রতিটি পুঞ্জির প্রধান বা সরদারকে বলা হতো ‘দলই’। এই দলইরা ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী। পুরো সিন্টেং সমাজের নেতৃত্ব মূলত ১২ দলইর হাতেই কেন্দ্রীভূত ছিল।


সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে আরও সুসংগঠিত করতে দলইরা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে প্রধান হিসেবে নির্বাচন করতেন। তাঁর উপাধি ছিল ‘সিয়েম’। ১২টি পুঞ্জি সিয়েমের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হলে সেই রাজনৈতিক সংগঠনকে বলা হতো ‘হিমা’।


সাধারণত সুতংগা পুঞ্জির দলইকে হিমার সিয়েম নির্বাচিত করা হতো বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।


জৈন্তিয়া পাহাড়কে ‘১২ দলইর দেশ’ হিসেবে দেখার ঐতিহাসিক ধারণার সঙ্গে এ তথ্যের মিল রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় জৈন্তিয়া পাহাড়ে ১২টি ডলোইশিপ বা প্রশাসনিক এককের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব এলাকার সংখ্যা ও নাম নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে কিছু পার্থক্য রয়েছে।


সমতলে সিয়েমের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা


আসিফ আযহারের গবেষণায় বলা হয়েছে, আনুমানিক ১৫০০ সালের কাছাকাছি সময়ে সুতংগা পুঞ্জির দলই এবং হিমার সিয়েম মানগোসাঁই বা বড়গোসাঁই জৈন্তিয়া সমভূমির কর্তৃত্ব লাভ করেন। এর মাধ্যমে তিনি সমতলের রাজা হিসেবে আবির্ভূত হন এবং নতুন সিন্টেং রাজবংশের সূচনা করেন বলে লেখক উল্লেখ করেছেন।


হিমার সিয়েম এবং সমতলের রাজা একই ব্যক্তি হওয়ায় জৈন্তিয়া পাহাড় ও সমভূমির মধ্যে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে সিন্টেং সমাজে প্রথম দিকের এই শাসকদের শুধু হিমার সিয়েম হিসেবেই গ্রহণ করা হতো; তারা সমতলের ‘রাজা’ হিসেবে পুরোপুরি স্বীকৃত ছিলেন না বলে লেখকের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।


রাজা যশোমাণিকের সময় থেকে সিন্টেং দলইরা রাজদরবারে অংশ নিতে শুরু করেন বলে ধারণা করা হয়। এরপর হিমার সিয়েম সিন্টেংদের কাছেও রাজা হিসেবে স্বীকৃতি পান। দলইরা সিয়েমকে রাজা হিসেবে মেনে নেওয়ার পর ১২টি পাহাড়ি পুঞ্জিও জৈন্তিয়া রাজ্যের ‘রাজ’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।


স্বায়ত্তশাসিত ছিল ১২ পাহাড়ি রাজ


জৈন্তিয়া রাজ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও ১২টি পাহাড়ি এলাকা পুরোপুরি কেন্দ্রীয় শাসনের অধীন ছিল না। আসিফ আযহারের বর্ণনা অনুযায়ী, এগুলো ছিল অনেকটাই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল।


সিন্টেং দলইরা নিজ নিজ এলাকার স্বাধীন সরদার হিসেবে প্রশাসন পরিচালনা করতেন। তাদের নিজস্ব অর্থবল ও লোকবল ছিল। তারা মৌখিকভাবে রাজার আনুগত্য স্বীকার করতেন এবং প্রয়োজনের সময় রাজ্যের প্রতিরক্ষায় রাজাকে সহায়তা করতেন।


তাদের কাছ থেকে নিয়মিত কর আদায় করা হতো না। বরং আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিবছর রাজাকে একটি করে বলির পাঁঠা উপহার দেওয়ার রীতি ছিল বলে গ্রন্থটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। শারদীয় উৎসবের সময় ১২টি এলাকা থেকে ১২টি পাঁঠা রাজার কাছে পাঠানো হতো।


গবেষকের মতে, এই উপহার ছিল শুধু আনুগত্যের প্রতীক নয়; এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কও জড়িত ছিল। বহিরাগত শক্তির আক্রমণ থেকে জৈন্তিয়া রাজ্যকে রক্ষায় পাহাড়ি দলইদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে তিনি মনে করেন।


ঐতিহাসিক গবেষণাতেও জৈন্তিয়ার ডলোইরা শক্তিশালী স্থানীয় প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাদের কেউ কেউ সিয়েমের মন্ত্রী, দূত এবং নিজ নিজ এলাকার প্রশাসনিক প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন।


১২ পুঞ্জির নাম নিয়ে ঐতিহাসিকদের মতপার্থক্য


জৈন্তিয়া পাহাড়ের ১২টি পুঞ্জি বা প্রশাসনিক এলাকার নাম নিয়ে বিভিন্ন গ্রন্থে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। আসিফ আযহারের বইয়ে তিনটি আলাদা সূত্রের তালিকা পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে।


মোহাম্মদ আবদুল আজিজের ‘জৈন্তা রাজ্যের ইতিহাস’ অনুযায়ী:

সুতংগা, নরতিয়াং, নাথেলাং, নারপুহ, নংজিনি, নংবারেহ, লখডং, সাংপুং, ময়সু, জোয়াই, রাম্ভাই ও গোভা।


সৈয়দ মুর্তাজা আলীর ‘History of Jaintia’ অনুযায়ী:

Suhtnga, Nartiang, Natelang, Norpuh, Nongjhini, Nongbare, Lakhdong, Shangpung, Myuso, Jawai, Raliang ও Rambhai।


অধ্যাপক রাভি পুভাইয়ার তালিকা অনুযায়ী:

Sutnga, Nartiang, Nongtalang, Nangphyllut, Nongjngi, Nangbah, Lakadong, Shangpung, Mynso, Jowai, Raliang ও Amwi।


এই পার্থক্যকে ইতিহাসের অসঙ্গতি হিসেবে দেখার পরিবর্তে বিভিন্ন সময়ের প্রশাসনিক নাম, স্থানীয় উচ্চারণ, বানান এবং গবেষকদের ব্যবহৃত নামের ভিন্নতা হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন। গবেষণায় জৈন্তিয়া পাহাড়ে ১২টি ডলোইশিপের অস্তিত্বের কথা বিভিন্নভাবে নথিবদ্ধ হয়েছে। সৈয়দ মুর্তাজা আলীর তালিকাতেও Sutnga, Nartiang, Jowai, Nongjngi, Shangpung, Raliang, Mynso, Nongtalang, Rymbai, Lakadong, Nongbareh ও Narpuh-এর উল্লেখ পাওয়া যায়।


জৈন্তিয়া ইতিহাসে সিন্টেংদের গুরুত্ব


জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে সিন্টেং জনগোষ্ঠীর গুরুত্ব এখানেই যে, তারা শুধু একটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠী হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না; সময়ের সঙ্গে তাদের সামাজিক সংগঠন একটি সুসংবদ্ধ রাজনৈতিক কাঠামোতে রূপ নেয়। লাংদহ থেকে দলই, দলই থেকে সিয়েম এবং সিয়েমের নেতৃত্বে হিমা—এই ধারায় তাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে বলে আসিফ আযহারের গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে।


পরবর্তীতে হিমার সিয়েম যখন জৈন্তিয়া সমভূমির রাজা হিসেবে আবির্ভূত হন, তখন পাহাড় ও সমতলের মধ্যে যে রাজনৈতিক সংযোগ তৈরি হয়, সেটিই জৈন্তিয়া রাজ্যের পরবর্তী শক্তির অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।


গবেষণায় দেখা যায়, জৈন্তিয়া সমাজের রাজনৈতিক কাঠামো ছিল প্রচলিত রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন, দলইদের ক্ষমতা এবং সিয়েমের নেতৃত্ব—এই তিন স্তরের সমন্বয়ে একটি বিশেষ ধরনের শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। জৈন্তিয়া পাহাড়কে ঐতিহাসিকভাবে ১২ ডলোইর ভূখণ্ড হিসেবে উল্লেখ করার প্রবণতাও এই কাঠামোর গুরুত্বকে নির্দেশ করে।


‘জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন’ গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়ে আসিফ আযহার মূলত সেই সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনের ইতিহাস অনুসন্ধান করেছেন—যে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি বসতি থেকে সিন্টেং সমাজ একটি সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয় এবং শেষ পর্যন্ত জৈন্তিয়া রাজ্যের পাহাড় ও সমতলের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।


বই: জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন

অধ্যায়: ৪ — সিন্টেং বা জৈন্তিয়া জনগোষ্ঠীর কথা

লেখক: আসিফ আযহার


"Internet Archive-এ ‘জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন’ বইটি পড়ুন/ডাউনলোড করুন" (https://reference-url-citation.invalid/9)

© চ্যানেল জৈন্তা নিউজ
channeljaintanews24.com