Template: 2
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
লিংক channeljaintanews24.com ক্যাটাগরি মৌলভীবাজার রিপোর্ট চ্যানেল জৈন্তা নিউজ

বর্ষার জলে নতুন রূপে হামহাম জলপ্রপাত, গহীন অরণ্যে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য

১৪ আগস্ট ২০২৬ • ০৪:৫৮ অপরাহ্ন

কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি:

“ঐ আসে ঐ ঘন গৌরবে নব যৌবনা বর্ষা, শ্যামল গম্ভীর সরসা”—কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার মতোই আকাশভাঙা বৃষ্টির জলধারা যেন নতুন প্রাণস্পন্দন জাগিয়ে তুলেছে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের কুরমা বনবিটের গহীন অরণ্যে। বর্ষার ভরা মৌসুমে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে সেজেছে দুর্গম এলাকার হামহাম জলপ্রপাত। ইট-পাথরের যান্ত্রিক জীবন থেকে একটু দূরে গিয়ে রোমাঞ্চকর প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে পর্যটকদের কাছে এটি এখন অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য।


স্থানীয় আদিবাসীদের ভাষায় ‘হামহাম’ শব্দের অর্থ প্রবল বেগে পানি পড়ার শব্দ। বর্ষায় জলপ্রপাতটির পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় নামের সার্থকতাও যেন পূর্ণতা পেয়েছে।


গহীন অরণ্যে প্রকৃতির বিস্ময়


পাহাড়ের বুক চিরে সবুজ অরণ্যের দেয়াল ভেদ করে প্রায় ১৫০ থেকে ১৬০ ফুট ওপর থেকে নিচে আছড়ে পড়ছে স্বচ্ছ জলের ধারা। পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে আসা এই স্রোত সমতলে সৃষ্টি করেছে মনোমুগ্ধকর এক পরিবেশ। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কিছুটা কমে গেলেও বর্ষায় হামহাম জলপ্রপাত হয়ে ওঠে প্রমত্ত ও অপরূপ সুন্দরী।


চোখজুড়ানো এই জলপ্রপাত কমলগঞ্জের পর্যটন খাতকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রশস্ত জলপ্রপাত হিসেবে পরিচিত।


আবিষ্কারের নেপথ্যে


২০১০ সালের শেষ দিকে পর্যটন ইকোট্যুর গাইড শ্যামল দেববর্মার সঙ্গে একদল রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটক দুর্গম এই জঙ্গলে প্রবেশ করে হামহাম জলপ্রপাতটি আবিষ্কার করেন। পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি দল জলপ্রপাতটি পরিদর্শন করে। এরপর থেকেই দেশজুড়ে হামহাম জলপ্রপাত নিয়ে শুরু হয় আলোচনা ও পর্যটকদের আগ্রহ।


দুর্গম পথেই আসল রোমাঞ্চ


মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে ইসলামপুর ইউনিয়নের রাজাকান্দি রেঞ্জের চম্পারায় চা-বাগান। কুরমা বনবিটের প্রায় ৮ কিলোমিটার গভীরে এবং ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তঘেঁষা এলাকায় অবস্থিত হামহাম জলপ্রপাত।


কমলগঞ্জ চৌমুহনা চত্বর থেকে চাম্পারায় চা-বাগান পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার পাকা সড়ক রয়েছে। এ পথে হাইয়েস মাইক্রোবাস, জিপ ও চান্দের গাড়িতে যাওয়া যায়। এছাড়া সিএনজি ও মোটরসাইকেলে চাম্পারায় চা-বাগানের কলাবন বস্তি বা ত্রিপুরা আদিবাসী পল্লী ‘তৈলংবাড়ী’ পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব।


এরপর শুরু হয় মূল ট্র্যাকিং। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা, পিচ্ছিল, উঁচু-নিচু ও সরু পথ পেরিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা হাঁটতে হয় জলপ্রপাতের কাছে পৌঁছাতে। দুর্গম পথে ভারসাম্য রক্ষায় বাঁশের লাঠিই হয়ে ওঠে পর্যটকদের অন্যতম ভরসা।


বন্য প্রকৃতির সঙ্গে মিতালি


হামহামে যাওয়ার পথে পাড়ি দিতে হয় ‘মাকাম’ নামের একটি উঁচু টিলা। বর্ষাকালে টিলার পথ অত্যন্ত পিচ্ছিল হয়ে ওঠে। পথজুড়ে জারুল, চিকরাশি ও কদম গাছের ডালে দেখা মেলে নানা রঙের পাখি ও প্রজাপতির। ডুমুর, বাঁশ ও বেতবাগানের মাঝেও কখনো দেখা মিলতে পারে দুর্লভ চশমা বানরের।


বনের ভেতরের পাহাড়ি ঝিরিপথ ধরে কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি পেরিয়ে এগোতে হয়। জলপ্রপাতের প্রায় আধা কিলোমিটার দূর থেকেই কানে ভেসে আসে পানির স্রোতের গর্জন। সেই শব্দ যেন দীর্ঘ পথের ক্লান্তি মুহূর্তেই ভুলিয়ে দেয়।


পর্যটকদের চোখে হামহাম


হামহাম ভ্রমণে আসা লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির শিক্ষার্থী হেরোলাস, ডিফ্রাংকি, সুহান ও ক্লিনটন বলেন, তাঁদের এলাকায় এত সুন্দর একটি জায়গা রয়েছে, তা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতেন। তবে আগে কখনো আসা হয়নি। কলাবন থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা হাঁটার পর হামহামের মূল স্থানে পৌঁছানোর পর মুহূর্তেই সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায় এবং মন ভরে যায় প্রকৃতির সৌন্দর্যে।


ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা আশফাক করিম বলেন, হামহাম দেখার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় বর্ষাকাল। এর প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে কিছুটা কষ্ট করে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েই আসতে হবে।


পর্যটকদের জন্য সতর্কতা


হামহাম জলপ্রপাতের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার বিষয়েও সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বনের ভেতরে চিপসের প্যাকেট, সিগারেটের ফিল্টার, প্লাস্টিকের বোতল কিংবা খাবারের উচ্ছিষ্ট যেখানে-সেখানে না ফেলে সঙ্গে করে নিয়ে এসে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে।


এ ছাড়া পাহাড়ি ও পিচ্ছিল পথে হাঁটার জন্য ভালো গ্রিপযুক্ত ট্র্যাকিং জুতা ব্যবহার করা জরুরি। বর্ষায় জোঁকের উপদ্রব থাকায় পর্যটকদের সতর্ক থাকতে হবে। স্থানীয়রা ট্র্যাকিংয়ের জন্য বাঁশের তৈরি লাঠিও বিক্রি করেন।


প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর রোমাঞ্চের অনন্য সমন্বয় হামহাম জলপ্রপাত। বর্ষার পানিতে যখন পাহাড় বেয়ে গর্জন করে নেমে আসে জলধারা, তখন গহীন অরণ্যের নীরবতা ভেঙে সৃষ্টি হয় এক মায়াবী দৃশ্য—যা একবার দেখলে দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো।

বিজ্ঞাপন channeljaintanews24.com