মহররম মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত: একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা — হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
ধর্মীয় ফিচার প্রতিবেদন:
নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বা’দ।
প্রিয় পাঠকবৃন্দ, আমি হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী আজ আপনাদের সামনে মহররম মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরছি। “ওয়ামা তাওফিকি ইল্লা বিল্লাহ।”
মহররম হিজরি বর্ষের প্রথম মাস। এই মাসে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রতিটি মুসলমানের একমাত্র কামনা হলো—তিনি যেন মুসলিম উম্মাহকে সারা বছর রহমত, বরকত ও কল্যাণে পরিপূর্ণ রাখেন। এই মাসে রোজা রাখা বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুমহান আদর্শ।
আশুরার রোজার গুরুত্ব
হাদিসের আলোকে আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখেন ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখছে। তখন তিনি বলেন, “আমরা হজরত মূসা (আ.)-এর অনুসরণের ক্ষেত্রে তাদের চেয়ে বেশি অধিকার রাখি।” এরপর তিনি নিজেও এ দিনে রোজা রাখেন এবং অন্যদেরও নির্দেশ দেন।
(বোখারি শরিফ, ১ম খ-, পৃ. ২৫৮)
অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে, ইহুদি ও খ্রিস্টানরা এ দিনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে রোজা রাখে। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজার সঙ্গে ৯ অথবা ১১ তারিখ মিলিয়ে রোজা রাখতে বলেছেন, যাতে তাদের সঙ্গে সাদৃশ্য না হয়। (ফাতাওয়ায়ে শামী, ৩য় খ-, পৃ. ৩৩৫)
আশুরার ফজিলত
ইমাম বায়হাকী (রহ.) তাঁর ‘শুআবুল ঈমান’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, যে ব্যক্তি আশুরার দিনে খালেছ নিয়তে দান-খয়রাত করে, আল্লাহ তাআলা তার সারা বছরের রিজিকের মধ্যে বরকত দান করেন।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে আশুরা ও রমজান মাস ছাড়া অন্য কোনো সময় এত গুরুত্ব দিয়ে রোজা রাখতে দেখেননি। (বুখারি, মুসলিম)
হজরত আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, আশুরার রোজার মাধ্যমে বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। (ইবনে মাজাহ, মুসলিম)
নবী করিম (সা.) আরও ইরশাদ করেন, “রমজানের পর যদি তুমি রোজা রাখতে চাও, তবে মহররম মাসে রাখো। কারণ এটি আল্লাহর মাস।” (জামে তিরমিজি ১/১৫৭)
উপরোক্ত হাদিসগুলো থেকে স্পষ্ট হয়, আশুরার দিন অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। তাই মহররম মাসে বিশেষ করে ৯, ১০ ও ১১ তারিখে রোজা রাখার গুরুত্ব রয়েছে। আল্লাহ সবাইকে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
মহররম মাসের ঐতিহাসিক ঘটনা
মহররম হিজরি বর্ষের প্রথম মাস এবং ১০ তারিখ (আশুরা) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ দিনে বহু ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে—
১) হজরত আদম (আ.)-এর তওবা কবুল হয়।
২) হজরত নূহ (আ.)-এর জাহাজ মহাপ্লাবন থেকে মুক্তি পায় এবং জুদি পাহাড়ে স্থির হয়।
৩) হজরত মূসা (আ.) ও বনি ইসরাইল ফেরাউনের কবল থেকে মুক্ত হন।
৪) হজরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পান।
৫) হজরত ঈসা (আ.)-এর জন্ম ও আসমানে উত্তোলনের ঘটনা ঘটে বলে বর্ণিত আছে।
৬) পূর্ববর্তী নবীগণ এ দিনে রোজা রাখতেন।
৭) রমজানের আগে আশুরার রোজা ফরজ ছিল, পরে নফল করা হয়।
৮) আসমান-জমিন, আরশ-কুরসি, বেহেশত ইত্যাদি এ দিন সৃষ্টি হয়েছে বলে বর্ণিত।
৯) প্রথম বৃষ্টিপাত এ দিন সংঘটিত হয়।
১০) হজরত ইবরাহিম (আ.) জন্মগ্রহণ ও অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তি লাভ করেন।
১১) হজরত সোলাইমান (আ.)-কে রাজত্ব দান করা হয়।
১২) হজরত ইয়াকুব (আ.) দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান।
১৩) হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এ দিন শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেন।
উপসংহার
মহররম মাসের এসব ঘটনা ও ফজিলত আমাদের জন্য শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার উৎস। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই মাসের বরকত ও ফজিলত লাভ করার তাওফিক দান করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।
লেখক:
হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি
সাবেক ইমাম ও খতীব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট