দুর্যোগ আইন ও স্থায়ী নির্দেশনা পর্যালোচনার তাগিদ স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর
দেশে বিদ্যমান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ও স্থায়ী নির্দেশনায় দুর্যোগকালীন সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা ও বাধ্যবাধকতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম. এ. মুহিত। এ কারণে আইন ও স্থায়ী নির্দেশনাগুলো দ্রুত পর্যালোচনা ও হালনাগাদের তাগিদ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ভূমিকম্পের মতো বড় ধরনের দুর্যোগে ঢাকার মতো মেগাসিটিতে শুধু জানমালের ক্ষতিই হবে না, ভেঙে পড়তে পারে দেশের ‘নার্ভ সেন্টার’ খ্যাত রাজধানীর সামগ্রিক সেবা ব্যবস্থা।
সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত “দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন ও নগর স্বাস্থ্য” শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ আরবান হেলথ নেটওয়ার্ক এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ড্যাবের মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল, ইউনিসেফের চিফ অব হেলথ ডা. মালাই আহমাদজাইসহ সংশ্লিষ্ট খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির উদাহরণ টেনে বলেন, “রানা প্লাজা ছিল মাত্র একটি ১০ তলা ভবন। সেই একটি ভবন ধসের পর আমরা দেখেছি এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং আড়াই হাজার মানুষের আহত হওয়ার ভয়াবহ চিত্র। আল্লাহ না করুক, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ মেগাসিটিতে যদি এমন ১০০ বা ২০০ ভবন ধসে পড়ে, তবে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা কল্পনা করাও কঠিন।”
তিনি আরও বলেন, “ঢাকা দেশের ২০ কোটি মানুষের কেন্দ্রবিন্দু। ভূমিকম্পে এখানকার হাসপাতালগুলো ধসে পড়তে পারে, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।”
দুর্যোগকালীন দায়িত্বের আইনি অস্পষ্টতা দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করে ড. মুহিত বলেন, “আমাদের যে দুর্যোগ আইন রয়েছে, তা রিভিউ করা উচিত। এই খাতে কর্মরত আইনবিদ, জনস্বাস্থ্যবিদ এবং প্রকৌশলীরা বসে যদি আইনটি হালনাগাদের জন্য সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তৈরি করেন, তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার তা বাস্তবায়নে দ্রুত উদ্যোগ নেবে।”
এ সময় তিনি জরুরি চিকিৎসা-পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সমাজকল্যাণ এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “যেকোনো দুর্যোগে মানুষ শুধু শারীরিকভাবেই নয়, মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এমনকি উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবকরাও তীব্র মানসিক ট্রমার শিকার হন। আমাদের সামগ্রিক পরিকল্পনায় এই সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলিংয়ের বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে, অথচ এটি অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।”
তিনি ঢাকার ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলায় লাখো তরুণকে সম্পৃক্ত করে একটি দক্ষ ‘স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী’ গঠন এবং তাদের পেশাদার প্রশিক্ষণের ওপরও জোর দেন।
আন্তর্জাতিক দুর্যোগ গবেষণা হাব হওয়ার সম্ভাবনা
সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগের কথা তুলে ধরে ড. এম. এ. মুহিত জানান, মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে গাজীপুরে ‘ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিসার্চ’ চালু করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্রামীণ বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আরও বেশি ফিল্ড রিসার্চ সেন্টার গড়ে তোলা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘হাব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশ বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারবে।