অনলাইন ডেস্ক।
পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সিলেট বিভাগজুড়ে জমে উঠতে শুরু করেছে কোরবানির পশুর বাজার। প্রাথমিক হিসাব ও পশুর সংখ্যা অনুযায়ী, এবার পুরো বিভাগে প্রায় ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকার বিশাল অর্থনৈতিক লেনদেনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে বিপুল এই বাজারকে ঘিরে স্থানীয় খামারিদের বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে পশুখাদ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি। যদিও স্বস্তির খবর হলো— এবার সিলেট বিভাগে কোরবানির পশুর কোনো ঘাটতি নেই।
পশুর সংখ্যা ও চলতি বাজারদরের ভিত্তিতে তৈরি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সিলেট বিভাগের কোরবানিযোগ্য মোট ২ লাখ ৮৫ হাজার পশুর আনুমানিক বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। ফলে কোরবানির পশুকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এবার রেকর্ড পরিমাণ অর্থ হাতবদলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় খামারিরা জানান, দেশে প্রচলিত প্রায় সব ধরনের পশুখাদ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। সয়াবিন খৈল, গমের ভুসি, সরিষার খৈল, ভুট্টা, মসুর ও মুগের ভুসিসহ অধিকাংশ খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক, ছোট ও মাঝারি খামারিরা।
কোরবানির পশু ব্যবসায়ী আজাদ মিয়া বলেন, “এবার ঈদের জন্য ৫টি গরু কিনেছি। কয়েক মাসে শুধু খাবার ও পরিচর্যাতেই অতিরিক্ত প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন বাজারে ভালো দাম না পেলে লাভ তো দূরের কথা, আসল খরচই উঠবে না।”
এদিকে পশু মোটাতাজাকরণে কোনো ধরনের অনিয়ম বা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে খামারিদের সচেতন করতে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্টেরয়েড বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার না করার জন্য খামারিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নিরাপদ উপায়ে পশু পালনে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এবার সিলেট বিভাগে কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে রয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ২৫টি ষাঁড়, ৩৫ হাজার ২৮৭টি বলদ, ২৮ হাজার ৭৯০টি গাভী, ৬ হাজার ৩৬৬টি মহিষ, ৭৩ হাজার ৮৮১টি ছাগল, ১৯ হাজার ৭৮টি ভেড়া এবং ৩ হাজার ৪৩৭টি অন্যান্য পশু।
চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পশু প্রস্তুত হয়েছে সিলেট জেলায়। সেখানে চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৯৩৮টি পশুর বিপরীতে প্রস্তুত রয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৫টি পশু। গত বছরের তুলনায় জেলায় চাহিদা বেড়েছে ২০ হাজার ৩৯৭টি এবং উৎপাদন বেড়েছে ৫ হাজার ৭০৭টি। জেলার খামারগুলোতে বর্তমানে ৪৫ হাজারের বেশি ষাঁড় ছাড়াও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বলদ, গাভী, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া রয়েছে।
মৌলভীবাজার জেলায় এবার কোরবানিযোগ্য পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে ৭১ হাজার ৭৭২টি। প্রস্তুত রয়েছে ৭৪ হাজার ৫৮৪টি পশু। তবে গত বছরের তুলনায় সেখানে চাহিদা কমেছে ৭ হাজার ১৫১টি এবং উৎপাদন কমেছে ৬ হাজার ৫৩টি।
হবিগঞ্জে চাহিদা রয়েছে ৪৬ হাজার ৩৫০টি পশুর বিপরীতে প্রস্তুত রয়েছে ৫০ হাজার ৮০২টি পশু। গত বছরের তুলনায় সেখানে চাহিদা কমেছে ১৯ হাজার ২৩২টি এবং উৎপাদন কমেছে প্রায় ২০ হাজার পশু।
অন্যদিকে সুনামগঞ্জে চাহিদা বেড়েছে ৬ হাজার ৯৯০টি। সেখানে প্রস্তুত রয়েছে ৫২ হাজার ৫১৩টি পশু, যা স্থানীয় চাহিদার চেয়েও বেশি।
বিক্রেতারা জানান, এবার কোরবানির হাটে মহিষ গড়ে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা, ষাঁড় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, বলদ ১ লাখ টাকা, গাভী ৯০ হাজার টাকা, ছাগল ১৫ হাজার টাকা এবং ভেড়া ১২ হাজার টাকা দরে বিক্রি হতে পারে। এছাড়া ছোট গরু ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। সব মিলিয়ে এবার কোরবানির পশুর বাজারে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি হাতবদলের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ হিসাবের বাইরে থাকবে চামড়ার বাজার।
সার্বিক প্রস্তুতি ও পশুর সরবরাহ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সিলেট বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ড. আবু জাফর মো. ফেরদৌস। তিনি বলেন, “এবার সিলেট বিভাগে কোরবানিযোগ্য পশুর কোনো ঘাটতি নেই। বরং চাহিদার তুলনায় উদ্বৃত্ত পশু থাকবে। তাই বাইরে থেকে পশু আনার প্রয়োজন হবে না।”