
সিলেট।।
খবরটি শুনে আমি প্রথমে চমকে উঠি। একজন সাংবাদিক তার ফেসবুকে পোস্ট করেছেন, শাহজালাল মাজারের ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এরপর থেকে সামাজিক মাধ্যমে খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কেউ বলছেন, ‘মাজারের ভক্ত তাড়াতে গাছ কাটা হয়েছে।’ ফেসবুক থেকে তথ্য নিয়ে কেউ সংবাদগল্প লিখেছেন, ‘উন্নয়নের নামে ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ হত্যা।’- এ ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন স্থানে আলাপ-টালাপ চলছে। কারো মতে-এ খেজুর গাছ শতবর্ষী, ইয়েমেন দেশ থেকে এসেছে ইত্যাদি। বিষয়টি আমাকে কৌতূহলী করে তোলে। আমি মাজারে ঘুরে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম।
বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) রাত ১০টার দিকে গেলাম শাহজালাল (র.)-এর মাজারে। দরগা মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি মুফতি শাহেদ সাহেবের সঙ্গে আলাপ করলাম। তিনি জানালেন, গাছ কাটার খবরে গুজব ছড়ানো হয়েছে। প্রকৃত খবর এটি নয়। তিনি আরও জানান, বিকৃত করে অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। আসল ঘটনাকে চেপে গিয়ে গাছ কাটার বিষয়টি সামনে এনে একপেশে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। তথ্য যাচাই না করে কোনো এক সাংবাদিক তার ফেসবুকে এ গুজব ছড়িয়ে দেন। প্রকৃতপক্ষে, নতুন মসজিদ ভবন তৈরির জন্য শাহজালাল (র.)-এর দরগাহে মসজিদের পুরনো ভবনটি ভাঙা হবে। পুরনো মসজিদ ভেঙে সেখানে ৬ তলা ভবনের মসজিদ নির্মাণ করা হবে। এর ফলে দু’তিন বছরের জন্য সামনের উঠানে অস্থায়ীভাবে মসজিদ বানানোর প্রয়োজন পড়েছে। সাবেক মসজিদ পুনরায় নতুন করে নির্মাণের আগ পর্যন্ত ‘বৃহত্তর মুসল্লি’ এখানে নামাজ আদায় করবেন। আমাকে একই কথা জানালেন শাহজালাল (র.)-এর মাজারের মোতাওয়াল্লী। তিনি জানান, এটা সম্পূর্ণ গুজব। এ বিষয়ে তারা প্রেস ব্রিফিং করে প্রকৃত ঘটনা জানাবেন।
মাজার সংশ্লিষ্ট অথরিটির সঙ্গে আলাপ শেষে মাজারের খেদমতে থাকা পরিচিত শাহিন ভাইয়ের মাধ্যমে ঘটনার ক্রসচেক করলাম। মাজারে সবসময় থাকেন এমন পরিচিত ভক্তদের কাছেও ঘটনাটা জানার চেষ্টা করলাম । তারা জানান, পুরনো মসজিদ ভাঙার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাই উঠানের খেজুর গাছ কাটা হয়েছে। এখানে আপাতত দু’এক বছরের জন্য অস্থায়ী একটি মসজিদ বানানো হবে। খেজুর গাছ রেখে মসজিদ বানালে ভিতরে পানি পড়বে।
মাজারের মোতাওয়াল্লী আরও জানান, দরগার মাঠের খেজুর গাছের বয়স ২০ বছর। এই গাছগুলো কোনোভাবেই শতবর্ষী নয়। আর এই খেঁজুর গাছ ইয়েমেন দেশ থেকেও আসেনি। বাংলাদেশি চারা থেকেই ২০ বছরে খেজুর গাছ এতটুকু বড় হয়েছে। মসজিদ নির্মাণের প্রয়োজনে গাছগুলো কাটা হচ্ছে। তবে মাজারের গেইটের বাম দিকের অফিস ঘরের সামনের খেজুর গাছ কাটার প্রয়োজন হবে না। তাই ওই খেজুর গাছ থাকবে।
এখন ফিরে আসি ‘বৃহত্তর মানুষের প্রয়োজন প্রসঙ্গে’। একটা কথা প্রচলিত আছে,‘প্রয়োজন আইন মানে না। প্রয়োজন হলে দেশে-দেশে যুদ্ধও লেগে যায়। এসব প্রয়োজনে অনেক সময় সম্পদের ক্ষতি হয়। দরগা মসজিদ কমিটির প্রয়োজন হয়েছে, মাঠের গাছগুলো কাটতেই হবে, তা-না হলে উঠানে অস্থায়ী মসজিদ নির্মাণ করা যাবে না। মোতাওয়াল্লীর কাছ থেকে শুনলাম- তারা গাছ কাটার আগে গাছ বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। তাদের মিটিংয়ে ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে বসেছিলেন। গাঁছ বাঁচিয়ে নামাজের ব্যবস্থা করা যায় কিনা- তা নিয়ে সেই মিটিংয়ে আলাপ হয়েছে। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের মাথায় আর কুলায়নি। উপায় না পেয়ে খেজুর গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেন মসজিদ কমিটি। কারণ, গাছ রেখে অস্থায়ী মসজিদ বানালে পানি ঢুকে মসজিদের ফ্লোর ভাসতে পারে। মুসল্লিদের নামাজে অসুবিধা হতে পারে। তারা গাছের প্রতি আন্তরিক ছিলেন, কোনো উপায় না পেয়ে কেটে ফেলেছেন। আমি মনে করি, কাটার আগে আরও বিশেষজ্ঞ মত নেওয়া উচিত ছিল। তা হলে বিষয়টি এতদূর গড়াতো না।
ওই রাতে ১২টা পর্যন্ত মাজারের উঠানের জায়গাটা ঘুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করলাম। আমি দেখলাম, মাঠে একটা স্টিলের মাচাং করা হয়েছিল। পূর্বে এই মাচাং তৈরির সময় খেজুর গাছকে রক্ষার জন্য একটা গ্যাপ (ফাঁকা) অংশ খাঁজকাটা করে খালি রাখা হয়েছে। যাতে গাছের বেড়ে ওঠায় কোনো ত্রুটি না ঘটে। আরেকটা বিষয় খেয়াল করলাম, খেজুর গাছের নিচের জায়গাটিতে আগের মতোই ভক্ত-আশেকানরা শুয়ে আছেন। তাদেরকে কেউ তাড়িয়ে দিচ্ছে না। গুজবে বলা হয়েছিল-ভক্তদের তাড়াতেও গাছ কাটা হতে পারে। ব্যাপারটি আমার কাছে তেমন মনে হয়নি। মসজিদ কমিটি জানালেন, গেইটের খেজুর গাছ কাটা হবে না। ওটা ওখানে থাকবে। শুধু নামাজের স্থানের জায়গার গাছ কাটা হবে। নতুন মসজিদের কাজ শেষ হলে মাঠের এই অস্থায়ী মসজিদ ভেঙে ফেলা হবে। উঠানের ওই স্থানে আবার খেজুর গাছ লাগানো হবে। অথরিটি জানান, গাছ নিয়ে যে অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে, সে ব্যাপারে তারা সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরবেন।
নৈতিকতা ও তথ্য যাচাই :
প্রাইম প্রোগ্রেস নাইজেরিয়ার অনুসন্ধানী সাংবাদিক রিজয়েস ট্যাডি বলেন,‘বিভ্রান্তিকর তথ্য বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই অনেক বেশি লোক কথা বলে-এমন তথ্যগুলো যাচাই করা গেলে ব্যাপক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।’
পল ম্যাকনালি একজন সাংবাদিক এবং ডেভলপ এআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বলেন,‘এই নতুন সময়ে সাংবাদিকতায় স্বচ্ছতা এবং নৈতিক আচরণ আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, কোনও সাংবাদিক যদি অনৈতিকভাবে কাজটি করেন বা গোপন করেন এবং দর্শক তা ধরে ফেলে, তাহলে তাদের বিশ্বাসও পড়বে হুমকির মুখে।’
সাংবাদিকতার নৈতিকতা হলো সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের জন্য পেশাদারিত্ব ও নীতির একটি সমষ্টি, যার মধ্যে তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া অন্তর্ভুক্ত। এটি আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হলেও, এটি সাংবাদিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাদার ভিত্তি যা বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। আমার মনে হয়, খেজুর গাছ কাটার পিছনে যে মসজিদের বৃহত্তর মুসল্লিদের স্বার্থ রয়েছে, তা জানার চেষ্টা করেননি ওই ‘কথিত মাল্টিমিডিয়া’ সাংবাদিক। এর ফলে ভুল তথ্য দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি, ফেসবুকের তথ্য থেকে অনেক সাংবাদিক তাদের সংবাদপত্রেও সংবাদগল্প লিখেছেন। এসব রিপোর্টেও সাংবাদিকতার নৈতিকতা মানা হয়নি ও তথ্য যাচাই করা হয়নি। সংবাদ পরিবেশনের আগে তথ্য যাচাই করা, একাধিক উৎস থেকে মতামত নেওয়া এবং প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ করা জরুরি। কোনো তথ্য ছড়ানোর আগে খেয়াল রাখতে হবে, ওই তথ্যের নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতা আছে কিনা। সবার আগে সাংবাদিকতার কাজে স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। নিজের কাজে কোনো প্রকার ছলচাতুরি বা প্রতারণা না করা একজন সাংবাদিকের নৈতিক দায়িত্ব। সবচে বেশি প্রয়োজনীয় ‘বৃহত্তর জনস্বার্থ’-কে একজন সাংবাদিক অগ্রাধিকার দিবেন। শিরোনামে বিভিন্ন ট্যাগ ব্যবহার থেকে সরে এসে প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে হবে। গাছগুলো কাটার প্রয়োজন কেন পড়েছিল ? সেই প্রশ্নের ব্যখ্যা বিশ্লেষণ সকল পক্ষ থেকে আসা দরকার ছিল। তাহলে এ তথ্যকে ‘অপতথ্য’ দাবি করে সংবাদ সম্মেলন ডাকার প্রয়োজন পড়বে না।
সাংবাদিকদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। মনে রাখতে হবে, নৈতিকতা সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে। এটি একটি শক্তিশালী পেশাদার ভিত্তি হিসেবেও কাজ করে। তাই তথ্য যাচাইয়ের উৎস নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত অথরিটিকেই প্রামাণ্য বিবেচনায় আনা জরুরি। নৈতিকতা না মানলে ভাইরাল হওয়া তথ্যকে ‘অপতথ্য’ বলা হবে। সুতরাং ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর হিড়িক থেকে ‘তথাকথিত মাল্টিমিডিয়া’ সাংবাদিকদের বের হতে হবে। এইসব ভুয়া তথ্য উসকে দিতে পারে বিদ্বেষ। যা অবশ্যই কাম্য নয়।
লেখক : সাংবাদিক, বাংলা টিভি ও দৈনিক যায়যায়দিন (এইচআরসি মিডিয়া)।
Channel Jainta News 24 














